লেবাননের শিয়া মিলিশিয়া হিজবুল্লাহ সোমবার ভোরের ঘণ্টাগুলোতে উত্তর ইসরায়েল ও দক্ষিণ লেবাননের সীমান্তবর্তী এলাকা জুড়ে তীব্র সামরিক অভিযান চালিয়েছে। রকেট এবং ক্ষেপণাস্ত্রের মারকাটারি আক্রমণে ইসরায়েলের আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরীক্ষা ও চাপে পড়েছে।
হাইফার দক্ষিণে অবস্থিত ‘মিশমার আল-কারমেল’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ভোর সাড়ে ৪টার দিকে বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের মাধ্যমে গোষ্ঠীটি তাদের সামরিক সক্ষমতার পূর্ণ প্রয়োগ দেখিয়েছে।
দক্ষিণ লেবাননের আল-আদাইসা ও কিরিয়াত শমোনা, আল মালিকিয়া এলাকায় হিজবুল্লাহ একাধিক রকেট হামলা চালিয়ে ইসরায়েলি সেনাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। হিজবুল্লাহর দাবি, এই অভিযানে তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম হয়েছে। হামলার ধারাবাহিকতায় উত্তর ইসরায়েলের বসতিগুলো জনশূন্য হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হিজবুল্লাহর সুসংগঠিত এই সাঁড়াশি হামলা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং ইসরায়েল–লেবানন সীমান্তে পাল্টাপাল্টি গোলারষণের ঝুঁকি আরও বেড়েছে। এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতকে আরও জটিল ও বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
মাসব্যাপী যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল–ইরান সংঘাতের প্রভাবে উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। যুদ্ধবিরতির আলোচনা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে জোরালো তৎপরতা থাকলেও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সামরিক অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে রোববার (২৯ মার্চ) পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে তুরস্ক, সৌদি আরব, মিসর ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের অংশগ্রহণে উচ্চপর্যায়ের একটি কূটনৈতিক বৈঠক শুরু হয়েছে। দুই দিনব্যাপী এই আলোচনায় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং চলমান সংঘাত নিরসনের সম্ভাব্য কৌশল নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই বৈঠকটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে সরাসরি সংলাপে আনতে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সমন্বিত আঞ্চলিক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের জন্য পুনরায় সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত করার বিষয়ে। প্রথম দিনের বৈঠক শেষে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেন, অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর প্রতিনিধিরা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের দ্রুত ও টেকসই সমাধান খুঁজতে সম্ভাব্য কূটনৈতিক পথগুলো নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংলাপের সম্ভাবনাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। এদিকে বৈঠক শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে প্রায় ৯০ মিনিটব্যাপী টেলিফোন আলাপ করেন, যা গত পাঁচ দিনের মধ্যে তাদের দ্বিতীয় যোগাযোগ। এই ধারাবাহিক কূটনৈতিক যোগাযোগ চলমান সংকট নিরসনে আঞ্চলিক উদ্যোগের গুরুত্বকে আরও জোরালো করে তুলেছে। সার্বিক পরিস্থিতি থেকে প্রতীয়মান হয়, সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতাও সমান্তরালভাবে এগিয়ে চলেছে, যেখানে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো স্থল অভিযান বা ইরানি ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালায়, তার ফল হবে ভয়াবহ এবং মার্কিন সেনারা ‘হাঙ্গরের খোরাক’ হিসেবে ব্যবহৃত হবে। রোববার (২৯ মার্চ) ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাকারি এ কথা জানান। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসনের হুমকিকে “অবাস্তব” ও “উদ্ভট” আখ্যা দিয়েছেন এবং বলেন, বাহ্যিক চাপের কারণে এমন অসংলগ্ন সিদ্ধান্তে মার্কিন বাহিনী নিজেই ধ্বংসের মুখোমুখি হচ্ছে। জোলফাকারি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন বাহিনী ইতিমধ্যেই প্রতিদিন মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন, এবং ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঘাঁটিগুলো ছেড়ে তারা প্রতিবেশী দেশগুলোর বেসামরিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে; কিন্তু সেখানেও তারা হামলার হাত থেকে নিরাপদ নয়। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানি সশস্ত্র বাহিনী যেকোনো স্থল আগ্রাসনের ক্ষেত্রে দখলদার বাহিনীকে বন্দি বা নিশ্চিহ্ন করতে দ্বিধা করবে না। মুখপাত্রের বিবৃতিতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, মার্কিন নেতৃত্বের ভুল সিদ্ধান্ত ও সামরিক কৌশল পুরো বাহিনীকে বিপদে ফেলছে। তিনি মার্কিন সেনাদের প্রতি আহ্বান জানান, ইরানের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিন এবং অতীতে বিদেশি আগ্রাসীদের পরিণতি স্মরণ করুন। এর আগে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলী খামেনি ও শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের লক্ষ্য করে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু হয়। জবাবে ইরানি বাহিনী আঞ্চলিক ঘাঁটিগুলোতে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যা সংঘাতকে চরম উত্তেজনাপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে। সংক্ষেপে, ইরান মার্কিন স্থল আগ্রাসনের সম্ভাব্য যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে এবং প্রতিটি হামলার জবাবে চূড়ান্ত ও নির্ণায়ক পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত পাঁচটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলার অভিযোগ উঠেছে, যা আঞ্চলিক অর্থনীতি ও জননিরাপত্তায় তাৎপর্যপূর্ণ ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে এসব হামলার সঙ্গে ইরানের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে অবস্থিত ‘এমিরেটস গ্লোবাল অ্যালুমিনিয়াম’ কারখানায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও কর্মী আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। একই ধরনের হামলার খবর এসেছে বাহরাইনের ‘অ্যালুমিনিয়াম বাহরাইন’ স্থাপনাতেও। কুয়েতে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রাডার ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলার ফলে বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে, ওমানের সালালাহ বন্দরে ড্রোন হামলায় একজন বিদেশি কর্মী আহত হয়েছেন বলে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে। এদিকে সৌদি আরব দাবি করেছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশের চেষ্টা করা অন্তত ১০টি ড্রোন প্রতিরোধ করা হয়েছে। উল্লেখিত ঘটনাগুলোর প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের সমন্বিত হামলা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।