মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা এখনো সরাসরি বড় ধাক্কা না দিলেও এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে চীন। বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে কয়েক মাসের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত থাকায় তাৎক্ষণিক সংকটের আশঙ্কা নেই; প্রয়োজনে প্রতিবেশী রাশিয়া থেকেও সহায়তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য পথ এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে হিসাব-নিকাশ শুরু করেছে বেইজিং।
এদিকে রাজধানী বেইজিং-এ চলমান নীতিনির্ধারণী বৈঠকে অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির কৌশল নিয়ে আলোচনা করছেন শাসক দল চীনের কমিউনিস্ট পার্টি-র প্রতিনিধিরা। ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়া, দীর্ঘস্থায়ী সম্পত্তি খাতের সংকট এবং স্থানীয় সরকারের ঋণের চাপের মধ্যেই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটি নীতি নির্ধারণে মনোযোগী হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে চীনের জ্বালানি সরবরাহ ও সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, বিশেষত হরমুজ প্রণালী-র মতো গুরুত্বপূর্ণ রুটে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হলে এর প্রভাব বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ওই অঞ্চলে চীনের বিনিয়োগ ও আফ্রিকাসহ অন্যান্য বাজারেও এর প্রতিক্রিয়া পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা ইরান-এর সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্ক মূলত অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সহযোগিতাভিত্তিক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। যদিও ২০২১ সালে দুই দেশ ২৫ বছরের কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল, তবু বাস্তবে প্রতিশ্রুত বিনিয়োগের একটি অংশই বাস্তবায়িত হয়েছে।
কূটনৈতিক পর্যায়ে বেইজিং ইতোমধ্যে সংঘাত বন্ধে সংযম ও সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক শক্তির তুলনায় অর্থনৈতিক প্রভাবই চীনের প্রধান হাতিয়ার। ফলে বেইজিং সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর পরিবর্তে কূটনৈতিক উদ্যোগ ও বহুপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পথেই অগ্রসর হতে চাইছে।
ইরান ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও পুঁজিবাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় অপরিশোধিত তেলের দাম শুক্রবার (৬ মার্চ) মাত্র একদিনেই ব্যারেলপ্রতি ৯২ ডলার অতিক্রম করেছে, যা সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’য় জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ যাতায়াতের ওপর সংঘাতের প্রভাব পড়ায় সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা এবং ইরানের প্রতিক্রিয়ার ফলে এশিয়ার শেয়ারবাজারে ছয় বছরের মধ্যে সর্বাধিক দরপতন রেকর্ড করা হয়েছে, একই সময়ে মার্কিন ক্রুড তেলের দাম ১৯ শতাংশ বেড়ে ৮০ ডলারে পৌঁছেছে। বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ডলারের শক্তিশালী অবস্থার কারণে ইউরো ও ব্রিটিশ পাউন্ডের মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সংঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্যের সীমাবদ্ধ সমস্যা নয়, বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অস্থিরতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে সাধারণ জনগণ ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান উভয়ের জন্য জ্বালানি খরচ ও পুঁজিবাজারের পতন বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।
ইরানের রাজধানী তেহরান-এর প্রধান বাণিজ্যিক বিমানবন্দর মেহরাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর শনিবার (৭ মার্চ) ভোরে ব্যাপক হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। হামলায় বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে আগুন ও বিস্ফোরণের ঘটনা ধ্বনিত হয়েছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ও ছবিতে স্পষ্ট দেখা গেছে। প্রকাশিত ফুটেজে দেখা গেছে, একের পর এক বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে আগুনের বিশাল স্তূপ সৃষ্টি হচ্ছে। অপর ভিডিওতে হামলার তীব্রতা এবং বিস্ফোরণের ক্রমাগত মাত্রা দৃশ্যমান। ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী হামলার দায়িত্ব স্বীকার করে জানিয়েছে, তাদের বিমানবাহিনী ইরানের সরকারি অবকাঠামো লক্ষ্য করে তেহরানে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আন্তর্জাতিক আইন ও বিমান নিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়মের আলোকে এ হামলার প্রভাব এবং সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখা জরুরি।
ইরানের সামরিক কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, ওমান সাগরে অবস্থানরত মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন ইরানি ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। দেশটির খাতাম আল-আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানায়। বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানের সামুদ্রিক সীমান্ত থেকে প্রায় ৩৪০ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থান করার সময় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর ড্রোন ইউনিট রণতরীটির ওপর হামলা চালায়। হামলার পর জাহাজটি সহযোগী ডেস্ট্রয়ারসহ এলাকা ত্যাগ করে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল থেকে দূরে সরে গেছে বলে তেহরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৪’-এর অংশ হিসেবে পূর্বপরিকল্পিতভাবে এই অভিযান পরিচালিত হয়। এর আগে আইআরজিসি রণতরীটিকে লক্ষ্য করে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের কথাও জানিয়েছিল। ইরানের সামরিক সূত্র দাবি করেছে, হামলায় মার্কিন বাহিনীর উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং বেশ কিছু সেনা হতাহত হয়েছেন। তবে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য নিশ্চিত করেনি। ঘটনার পর ওমান সাগর ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের সামরিক তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই দাবির সত্যতা যাচাই না হলেও ঘটনাটি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাকে নতুন মাত্রা দিতে পারে।