ইরান ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও পুঁজিবাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় অপরিশোধিত তেলের দাম শুক্রবার (৬ মার্চ) মাত্র একদিনেই ব্যারেলপ্রতি ৯২ ডলার অতিক্রম করেছে, যা সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’য় জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ যাতায়াতের ওপর সংঘাতের প্রভাব পড়ায় সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা এবং ইরানের প্রতিক্রিয়ার ফলে এশিয়ার শেয়ারবাজারে ছয় বছরের মধ্যে সর্বাধিক দরপতন রেকর্ড করা হয়েছে, একই সময়ে মার্কিন ক্রুড তেলের দাম ১৯ শতাংশ বেড়ে ৮০ ডলারে পৌঁছেছে।
বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ডলারের শক্তিশালী অবস্থার কারণে ইউরো ও ব্রিটিশ পাউন্ডের মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সংঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্যের সীমাবদ্ধ সমস্যা নয়, বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অস্থিরতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে সাধারণ জনগণ ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান উভয়ের জন্য জ্বালানি খরচ ও পুঁজিবাজারের পতন বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।
দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সব ধরনের বিমান ও যাত্রী সেবা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যাত্রী, এয়ারলাইন্স ক্রু ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা চালায়। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান ইসরায়েলসহ সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার এবং মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে, যার প্রভাব বিমান ও পর্যটন সেবাতেও পড়েছে।
ইরান প্রথমবারের মতো সৌদি আরবের তেল খনি ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ঘাঁটির দিকে সমন্বিত ড্রোন ও ব্যালিস্টিক হামলা চালিয়েছে, তবে সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সফলভাবে সব লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করেছে। শুক্রবার (৬ মার্চ) সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, শায়েবাহ খনি লক্ষ্য করে ছোড়া ছয়টি ড্রোন এবং প্রিন্স সুলতান এয়ারবেস লক্ষ্য করে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে। হামলার কোনো ধরনের ক্ষতি হয়নি বলে মন্ত্রণালয় জানায়। এএফপি সূত্রেও এ খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সংলাপ চলেছিল, যা সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়। এর একদিন পর, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং ইসরাইল ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ শুরুর মাধ্যমে ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে। এরপর থেকে ইরান হামলার পাল্টা হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল-এর সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ক্রমাগত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনা আন্তর্জাতিক আইন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা এখনো সরাসরি বড় ধাক্কা না দিলেও এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে চীন। বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে কয়েক মাসের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত থাকায় তাৎক্ষণিক সংকটের আশঙ্কা নেই; প্রয়োজনে প্রতিবেশী রাশিয়া থেকেও সহায়তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য পথ এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে হিসাব-নিকাশ শুরু করেছে বেইজিং। এদিকে রাজধানী বেইজিং-এ চলমান নীতিনির্ধারণী বৈঠকে অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির কৌশল নিয়ে আলোচনা করছেন শাসক দল চীনের কমিউনিস্ট পার্টি-র প্রতিনিধিরা। ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়া, দীর্ঘস্থায়ী সম্পত্তি খাতের সংকট এবং স্থানীয় সরকারের ঋণের চাপের মধ্যেই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটি নীতি নির্ধারণে মনোযোগী হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে চীনের জ্বালানি সরবরাহ ও সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, বিশেষত হরমুজ প্রণালী-র মতো গুরুত্বপূর্ণ রুটে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হলে এর প্রভাব বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ওই অঞ্চলে চীনের বিনিয়োগ ও আফ্রিকাসহ অন্যান্য বাজারেও এর প্রতিক্রিয়া পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা ইরান-এর সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্ক মূলত অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সহযোগিতাভিত্তিক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। যদিও ২০২১ সালে দুই দেশ ২৫ বছরের কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল, তবু বাস্তবে প্রতিশ্রুত বিনিয়োগের একটি অংশই বাস্তবায়িত হয়েছে। কূটনৈতিক পর্যায়ে বেইজিং ইতোমধ্যে সংঘাত বন্ধে সংযম ও সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক শক্তির তুলনায় অর্থনৈতিক প্রভাবই চীনের প্রধান হাতিয়ার। ফলে বেইজিং সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর পরিবর্তে কূটনৈতিক উদ্যোগ ও বহুপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পথেই অগ্রসর হতে চাইছে।