মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ন্যাটো ও ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর বিরল ধরনের কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছেন। হরমুজ প্রণালী পুনর্দখল ও তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না দিলে ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করার হুমকি দিয়েছেন তিনি। বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’ প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালী রক্ষায় ইউরোপীয় অংশীদারদের দেরি ও অনীহা ট্রাম্পকে ‘কঠোর অবস্থান’ নিতে বাধ্য করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে ন্যাটোর মহাসচিবের মধ্যস্থতায় যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি ১৯ মার্চ এক যৌথ বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালীতে সামরিক অবদান রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিশ্লেষকরা ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে ‘ব্ল্যাকমেইল ডিপ্লোমেসি’ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
ইতিমধ্যে ইউক্রেনও ভয়াবহ হামলার শিকার হয়েছে। রাশিয়ার বাহিনী মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ৭০০-এর বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করে দেশটির মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও জ্বালানি অবকাঠামোতে ব্যাপক ক্ষতি করেছে। ইউক্রেন দাবি করেছে, বিপুলসংখ্যক ড্রোন ধ্বংস করা হলেও ১৪টি সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।
অন্যদিকে, পূর্ব ইউক্রেনের লুহানস্কে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অফ ওয়ার’ এই দাবিকে অতিরঞ্জিত হিসেবে অভিহিত করেছে, বাস্তবে লুহানস্কের ৯৯ শতাংশ আগেই রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে ছিল।
এখানে ট্রাম্পের ‘কূটনৈতিক চাপ’ এবং রাশিয়ার সামরিক পদক্ষেপ একসঙ্গে আন্তর্জাতিক উত্তেজনার মাত্রা বাড়িয়েছে, যা ইউরোপীয় ও মধ্যপ্রাচ্য অংশীদারদের জন্য নতুন রণনৈতিক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।
ইসরায়েলি বিমান হামলার ঘটনায় ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল খারাজি গুরুতর আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে। একই ঘটনায় তার স্ত্রী নিহত হয়েছেন বলেও খবরে উল্লেখ রয়েছে। প্রতিবেদন অনুসারে, বুধবার (১ এপ্রিল) সংঘটিত হামলায় ৮১ বছর বয়সী খারাজি আহত হন। তবে হামলাটি সরাসরি তাকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়েছিল কিনা, নাকি নিকটবর্তী অন্য কোনো স্থাপনায় আঘাত হানার ফলে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন—তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। উল্লেখ্য, কামাল খারাজি সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামির মেয়াদে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীতে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বৈদেশিক নীতি উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এ হামলা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করতে পারে এবং চলমান সংঘাতকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে।
ইরানের নতুন সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনি দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় এক মাস পার হলেও এখনও জনসাধারণের সামনে উপস্থিত হননি। এর ফলে তাঁর অবস্থান ও নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক জল্পনা সৃষ্টি হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের তৎকালীন সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ কয়েক ডজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর মোজতবা খামেনি ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। এরপর তিনি রাষ্ট্রীয় বিবৃতির মাধ্যমে নতুন দায়িত্বের খবর দেন, যা ইরানের টেলিভিশনে পড়া হয়। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে, নতুন সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনি পুরোপুরি সুস্থ এবং যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে জনসমক্ষে অনুপস্থিতি স্বাভাবিক। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, “মোজতবা খামেনি অক্ষত আছেন এবং জনসাধারণের সামনে না আসা শুধুমাত্র কৌশলগত সিদ্ধান্ত।” এর আগে ইরানে নিযুক্ত রাশিয়ান রাষ্ট্রদূত এলেক্সাই দেদভ জানিয়েছেন, সুপ্রিম লিডার ইরানে অবস্থান করছেন, তবে জনসমক্ষে আসার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করছেন। নিরাপত্তা ও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি বিবেচনায় এই অদৃশ্যতা একটি অবাঞ্ছিত না হলেও সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মোজতবা খামেনির এই জনসমক্ষে অদৃশ্যতা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক নজরকেও টানে, যেখানে ইরানের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক হোয়াইট হাউস উপদেষ্টা এবং ‘মাগা’ আন্দোলনের প্রভাবশালী মুখ স্টিভ ব্যানন। তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ছেলে ইয়ার নেতানিয়াহুকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর দাবি তুলে কঠোর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছেন। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) প্রদত্ত এক বক্তব্যে ব্যানন যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগকে উদ্দেশ করে বলেন, মিয়ামিতে অবস্থানরত ইয়ার নেতানিয়াহুকে অবিলম্বে দেশত্যাগে বাধ্য করে সামরিক ইউনিফর্মে সম্মুখযুদ্ধে পাঠানো উচিত। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ চলাকালে ক্ষমতাধরদের সন্তানরা নিরাপদে অবস্থান করলে তা নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। চলমান ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের সামরিক বাহিনীতে অংশগ্রহণ না করা নিয়ে দেশটির অভ্যন্তরেও সমালোচনা রয়েছে। ব্যাননের বক্তব্যে সেই বিতর্কই আরও উসকে উঠেছে। একইসঙ্গে এই আলোচনার বিস্তার ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছেলে ব্যারন ট্রাম্পকে নিয়েও অনলাইনে ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা শুরু হয়েছে, যেখানে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সন্তানদের যুদ্ধে অংশগ্রহণের দাবি উত্থাপন করা হচ্ছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রে ‘সিলেক্টিভ সার্ভিস’ ব্যবস্থার আওতায় তরুণদের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক, তবে ১৯৭৩ সালের পর থেকে কোনো বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ কার্যকর হয়নি। এর পাশাপাশি ব্যানন মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক কৌশল নিয়েও বিতর্কিত প্রস্তাব দেন। তিনি পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখলের আহ্বান জানান এবং এ ক্ষেত্রে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আঞ্চলিক মিত্রদের সম্পৃক্ত করার প্রস্তাব দেন। তিনি আরও দাবি করেন, উপসাগরীয় রাজপরিবারের সদস্যদের বিলাসবহুল জীবনযাপন ত্যাগ করে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে অংশ নেওয়া উচিত। তার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নৈতিকতা, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং যুদ্ধের দায়ভার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, স্টিভ ব্যাননের এ ধরনের মন্তব্য কেবল রাজনৈতিক অবস্থানই নয়, বরং চলমান সংঘাতকে আরও জটিল ও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।