চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে দুটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে ইরান, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
শুক্রবার (৩ এপ্রিল) পৃথক দুই ঘটনায় একটি এ-১০ মডেলের যুদ্ধবিমান হরমুজ প্রণালির নিকটে পারস্য উপসাগরে বিধ্বস্ত হয় এবং এর কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের মধ্যাঞ্চলে একটি এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান পতনের ঘটনা ঘটে বলে দাবি করা হয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও সামরিক সূত্র অনুযায়ী, দেশটির বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব হামলা পরিচালিত হয়েছে। একইসঙ্গে অন্তত পাঁচটি মার্কিন হেলিকপ্টারেও আঘাত হানার দাবি করা হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ নিশ্চিতকরণ না এলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, এ ধরনের ঘটনা চলমান কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করবে না এবং তিনি একে ‘যুদ্ধের বাস্তবতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্যমতে, একটি বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমানের উদ্ধার অভিযানের সময় আরও মার্কিন বিমান ও হেলিকপ্টার হামলার মুখে পড়ে, এতে কয়েকজন ক্রু সদস্য আহত হন।
এদিকে ইরানের সামরিক কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তাদের ‘উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি’ ব্যবহারের মাধ্যমে এ হামলা সফলভাবে পরিচালিত হয়েছে, যা দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে পূর্ববর্তী আন্তর্জাতিক দাবির বিপরীত ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের পাল্টাপাল্টি দাবি ও সামরিক উত্তেজনা আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলতে পারে এবং সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধানের পথকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার ছায়া কেটে, হরমুজ প্রণালি বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) থেকে সীমিত পরিসরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য পুনরায় খোলা হয়েছে। যুদ্ধকালীন স্থবিরতার পর জাপান ও ফ্রান্সের মালিকানাধীন চারটি জাহাজ প্রথমবারের মতো গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ অতিক্রম করেছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের উদ্বেগজনক দাম ও সরবরাহ সংকটের মধ্যে এই চলাচলকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরান লারাক দ্বীপের কাছে একটি অনুমোদিত বিশেষ রুট তৈরি করেছে, যা শিপিং অ্যানালিস্টরা ‘তেহরান টোল বুথ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই রুটে অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাঙ্কার, এলএনজি পরিবাহক এবং ইউরোপীয় কন্টেইনার শিপ অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইরান ও ওমান যৌথভাবে প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য ‘শান্তিকালীন প্রোটোকল’ চালু করতে যাচ্ছে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি জানিয়েছেন, প্রোটোকল যুদ্ধ শেষে কার্যকর হবে, যা চলাচলের নিয়মকানুন নির্ধারণ এবং তদারকি নিশ্চিত করবে। বিশ্ববাজারের অস্থিরতা হ্রাসে সীমিত জাহাজ চলাচল সহায়ক হলেও, স্থায়ী স্থিতিশীলতার জন্য মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ছাড়া বিকল্প নেই বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
ইসরায়েলি বিমান হামলার ঘটনায় ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল খারাজি গুরুতর আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে। একই ঘটনায় তার স্ত্রী নিহত হয়েছেন বলেও খবরে উল্লেখ রয়েছে। প্রতিবেদন অনুসারে, বুধবার (১ এপ্রিল) সংঘটিত হামলায় ৮১ বছর বয়সী খারাজি আহত হন। তবে হামলাটি সরাসরি তাকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়েছিল কিনা, নাকি নিকটবর্তী অন্য কোনো স্থাপনায় আঘাত হানার ফলে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন—তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। উল্লেখ্য, কামাল খারাজি সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামির মেয়াদে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীতে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বৈদেশিক নীতি উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এ হামলা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করতে পারে এবং চলমান সংঘাতকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে।
ইরানের নতুন সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনি দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় এক মাস পার হলেও এখনও জনসাধারণের সামনে উপস্থিত হননি। এর ফলে তাঁর অবস্থান ও নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক জল্পনা সৃষ্টি হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের তৎকালীন সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ কয়েক ডজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর মোজতবা খামেনি ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। এরপর তিনি রাষ্ট্রীয় বিবৃতির মাধ্যমে নতুন দায়িত্বের খবর দেন, যা ইরানের টেলিভিশনে পড়া হয়। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে, নতুন সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনি পুরোপুরি সুস্থ এবং যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে জনসমক্ষে অনুপস্থিতি স্বাভাবিক। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, “মোজতবা খামেনি অক্ষত আছেন এবং জনসাধারণের সামনে না আসা শুধুমাত্র কৌশলগত সিদ্ধান্ত।” এর আগে ইরানে নিযুক্ত রাশিয়ান রাষ্ট্রদূত এলেক্সাই দেদভ জানিয়েছেন, সুপ্রিম লিডার ইরানে অবস্থান করছেন, তবে জনসমক্ষে আসার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করছেন। নিরাপত্তা ও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি বিবেচনায় এই অদৃশ্যতা একটি অবাঞ্ছিত না হলেও সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মোজতবা খামেনির এই জনসমক্ষে অদৃশ্যতা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক নজরকেও টানে, যেখানে ইরানের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।