পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত দীর্ঘ উচ্চপর্যায়ের শান্তি আলোচনার পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে.ডি. ভ্যান্স জানান, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় নমনীয়তা ও সদিচ্ছা প্রদর্শন করলেও ইরান মার্কিন শর্ত মানতে সম্মত হয়নি।
ভ্যান্স বলেন, আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হলেও মূল ইস্যুতে মতপার্থক্য থেকেই গেছে। তাঁর ভাষায়, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি সুস্পষ্ট ও যাচাইযোগ্য প্রতিশ্রুতি যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাশা করেছিল, যা এখনো পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও দাবি করেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে দৃঢ় অঙ্গীকার প্রদর্শন না করায় আলোচনায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হলো ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা স্থায়ীভাবে সীমিত রাখা।
সংবাদ সম্মেলনে ভ্যান্স জানান, আলোচনায় ইরানের জব্দকৃত সম্পদসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে এলেও কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত ঐকমত্যে পৌঁছানো যায়নি। ফলে ২১ ঘণ্টাব্যাপী এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।
বৈঠক শেষে উভয় দেশের প্রতিনিধিদলই ইসলামাবাদ ত্যাগ করেছে বলে জানা গেছে। কূটনৈতিক মহলে এই অচলাবস্থাকে ভবিষ্যৎ আলোচনার সম্ভাবনার ওপর বড় ধরনের অনিশ্চয়তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইসরায়েলের তেল আবিবে সরকারবিরোধী ও ইরান যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে আদালত-নির্ধারিত জনসমাগম সীমা উপেক্ষা করে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। শনিবার (১১ এপ্রিল) হাবিমা স্কয়ারে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে অন্তত দুই হাজার বিক্ষোভকারী অংশ নেয় বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, যদিও আদালতের নির্দেশনায় সর্বোচ্চ এক হাজার জনের সীমা নির্ধারিত ছিল। জননিরাপত্তার স্বার্থে সুপ্রিম কোর্টের আরোপিত এই বিধিনিষেধ উপেক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলনামূলক সংযত ভূমিকা পালন করে এবং বড় ধরনের কোনো সংঘর্ষ ছাড়াই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখে। টানা ষষ্ঠ সপ্তাহ ধরে চলমান এই আন্দোলনে বামপন্থী ও সরকারবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন অংশ নিচ্ছে। তাদের প্রধান দাবি ছিল ইরান যুদ্ধের অবসান, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের বিচার এবং অতি-অর্থোডক্স জনগোষ্ঠীর সামরিক সেবা সংক্রান্ত নীতির বিরোধিতা। আয়োজকদের দাবি অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার মানুষ এদিন বিক্ষোভে অংশ নেয়। সমাবেশে বক্তারা সরকারের বিরুদ্ধে ‘স্থায়ী জরুরি পরিস্থিতি’ তৈরি করে গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত করার অভিযোগ তোলেন। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে জেরুজালেম ও হাইফাতেও। জেরুজালেমে ব্যারিকেড ভাঙার অভিযোগে কয়েকজনকে আটক করা হলেও পরে জরিমানা সাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হয়। সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়ে তেল আবিবে সমাবেশ সীমা ১ হাজার এবং হাইফায় ১৫০ জন নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি জনসমাগম ঘটে। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, শুধুমাত্র সংখ্যাগত সীমা অতিক্রম করলেই তাৎক্ষণিকভাবে বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়, বিশেষ করে নির্দিষ্ট এলাকায় নিরাপত্তা ঝুঁকি সীমিত থাকলে। বর্তমান যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতি সত্ত্বেও উত্তর ইসরায়েলে হিজবুল্লাহর সঙ্গে উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো জটিল রয়ে গেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের প্রস্তুতির মধ্যেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উচ্চপর্যায়ের শান্তি আলোচনা কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা ছাড়াই সমাপ্ত হয়েছে। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে টানা ২১ ঘণ্টা ধরে চলা এই সংলাপ শেষ পর্যন্ত ফলপ্রসূ না হওয়ায় কূটনৈতিক অচলাবস্থার ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়েছে। আলোচনায় অংশ নেওয়া মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে থাকা জে. ডি. ভ্যান্স জানান, যুক্তরাষ্ট্র তার নির্ধারিত ‘রেড লাইন’ বা অনড় শর্তসমূহ স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করলেও ইরান তা গ্রহণে অনাগ্রহ দেখিয়েছে। ফলে কোনো কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ওয়াশিংটনের ‘অতিরিক্ত ও বেআইনি দাবি’ই আলোচনায় অগ্রগতির পথে প্রধান অন্তরায়। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে সংযত অবস্থান গ্রহণ এবং ইরানের বৈধ অধিকার স্বীকৃতির আহ্বান জানান। উল্লেখ্য, এই সংলাপের আগে পাকিস্তান সরকার দুই দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা এবং প্রায় ১০ হাজার নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েনসহ নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। আলোচনার অংশ হিসেবে উভয় দেশের প্রতিনিধিরা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে পৃথক বৈঠকও করেন। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালিতে নৌ-নিরাপত্তা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসানসহ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে মতৈক্যের অভাবে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক অগ্রগতির বিষয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে. ডি. ভ্যান্সের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। শনিবার (১১ এপ্রিল) পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বরাত দিয়ে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে দেশটির গণমাধ্যম ডন। বৈঠকে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন রাজা নকভি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলে ছিলেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বৈঠকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। শাহবাজ শরিফ আশা প্রকাশ করেন, এই আলোচনা ভবিষ্যতে শান্তি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর আগে একই দিনে ইরানি প্রতিনিধিদলের সঙ্গেও পৃথক বৈঠক করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী।