ইরানি বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের প্রেক্ষাপটে উদ্ভূত জ্বালানি ঘাটতি মোকাবিলায় চীন-কে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া। বেইজিংয়ে শি জিনপিং-এর সঙ্গে বৈঠক শেষে এ ঘোষণা দেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ।
ল্যাভরভ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে রাশিয়া চীনের জ্বালানি ও সম্পদের ঘাটতি পূরণে সক্ষম এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সহযোগিতার জন্য মস্কো প্রস্তুত। বিশেষ করে ইরান-নির্ভর জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় চীনের শিল্প ও অর্থনীতিতে যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা লাঘবে এই প্রস্তাবকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, রাশিয়া-চীন কৌশলগত সম্পর্ক বর্তমান বৈশ্বিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও অটুট রয়েছে এবং এটি আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে একটি স্থিতিশীল জোট হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের ফলে ইরানের তেল রপ্তানি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে চীনের জ্বালানি সরবরাহে। এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার বিকল্প সরবরাহ প্রস্তাব আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
হরমুজ প্রণালি-এ যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত কঠোর নৌ-অবরোধের চাপের মুখে নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত তেলবাহী জাহাজ ‘রিচ স্টারি’ পুনরায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে বলে শিপিং সূত্রে জানা গেছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মঙ্গলবার পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলেও বুধবার জাহাজটি আবার হরমুজ প্রণালিতে ফিরে আসে। এর আগে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান-এর মধ্যে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ওয়াশিংটন এই নৌ-অবরোধ কার্যকর করে। যুক্তরাষ্ট্র সেন্ট্রাল কমান্ড দাবি করেছে, অবরোধ শুরুর প্রথম ২৪ ঘণ্টায় কোনো বাণিজ্যিক জাহাজই মার্কিন নিরাপত্তা বলয় অতিক্রম করতে পারেনি এবং কয়েকটি জাহাজকে বাধ্য হয়ে ফিরে যেতে হয়েছে। শিপিং ডেটা অনুযায়ী, চীনা মালিকানাধীন ‘রিচ স্টারি’ জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে মিথানল বহন করে রওনা হয়েছিল এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকায় এটি বাধার মুখে পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে চলমান এই উত্তেজনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ, নৌ-বাণিজ্য ও বিমা খাতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে এবং বৈশ্বিক বাজারে এর প্রভাব দ্রুত বিস্তার লাভ করছে।
চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও মার্চ–এপ্রিল সময়ে জ্বালানি তেল বিক্রিতে সন্তোষজনক অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি করেছে মহসেন পাকনেজাদ। তিনি বলেন, সংকটকালেও রপ্তানি অব্যাহত রয়েছে এবং অর্জিত আয়ের অংশ তেল খাত পুনর্গঠনে ব্যয় করা উচিত। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) আল জাজিরা-এর বরাতে জানা যায়, ফার্স নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে ইরানি অপরিশোধিত তেলের বাজারমূল্যও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অবরোধ কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরও উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক রুট হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে একটি চীনা ট্যাংকার অবরোধ উপেক্ষা করে গন্তব্যে পৌঁছেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। মিডল ইস্ট আই-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘রিচ স্টারি’ নামের ওই জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের হামরিয়া বন্দর থেকে প্রায় আড়াই লাখ ব্যারেল মিথানল বহন করে যাত্রা করে এবং উপসাগরীয় জলসীমা অতিক্রম করে বেরিয়ে যায়। জাহাজটির মালিকানা রয়েছে সাংহাইভিত্তিক একটি শিপিং কোম্পানির অধীনে। ঘটনাটি চলমান অবরোধ পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও নৌনিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বিশ্ব বাণিজ্যের কৌশলগত রুট হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি বহুজাতিক মিশন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। সোমবার (১৩ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, চলতি সপ্তাহে উভয় দেশ যৌথভাবে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের আয়োজন করতে যাচ্ছে, যেখানে আগ্রহী রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে সমন্বিত নিরাপত্তা কাঠামো গঠনের বিষয়ে আলোচনা হবে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ জানান, প্রস্তাবিত মিশনটি সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক এবং যুদ্ধরত কোনো পক্ষের বাইরে থেকে পরিচালিত হবে। অন্যদিকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেন, হরমুজে অস্থিতিশীলতার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও নৌবাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে। এদিকে চীন সব পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছে এবং উত্তেজনা প্রশমনে ভূমিকা রাখার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।