হরমুজা বেওয়া
লেখক,শিক্ষক ও নারী অধিকার কর্মী
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতা পূর্বকাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত, নারীরা নেতৃত্ব দিয়েছেন, আন্দোলন করেছেন, সংসদে গেছেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বও পালন করেছেন। তবে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠে—এই প্রতিনিধিত্ব কি শুধু প্রতীকি, নাকি এটি বাস্তবিক অর্থেই নারীর ক্ষমতায়নের প্রতিফলন?
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে নারী নেতৃত্বের একটি বিশাল অধ্যায় রয়েছে। বেগম রোকেয়া থেকে শুরু করে ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, এবং স্বাধীনতা-উত্তর কালে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মতো নেত্রীদের ভূমিকা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। দুই দশকের বেশি সময় ধরে দুই নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশ শাসন করেছেন। এমন নজির পৃথিবীর খুব কম দেশেই আছে।
তবে এই শীর্ষ নেতৃত্বই কি নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পরিপূর্ণ চিত্র? না, বাস্তবতা অনেক ভিন্ন। তৃণমূল থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতিতে এখনও নারীরা নানা বাধা, সহিংসতা, উপেক্ষা এবং পিতৃতান্ত্রিক মনোভাবের শিকার হন।
বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন রয়েছে, যা রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব অনুযায়ী মনোনয়ন দিয়ে পূরণ করা হয়। এটি নারীদের অন্তর্ভুক্তির একটি মাধ্যম হলেও, বাস্তবিক অর্থে তাদের নির্বাচনী মাঠে আসার সুযোগ খুব সীমিত।
অনেকেই বলেন, সংরক্ষিত আসনে থাকা নারী সংসদ সদস্যদের অনেকেই এলাকাভিত্তিক রাজনীতিতে সক্রিয় নন। এতে করে তারা প্রকৃত রাজনীতির মাঠে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন না, ফলে ভবিষ্যতে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।
তাই এখন সময় এসেছে—নারীদের সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণ আরও উৎসাহিত করার, এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে সাধারণ আসনে নারী প্রার্থী মনোনয়নের নীতিমালা বাস্তবায়ন করার।
বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী সদস্য দেখা গেলেও, সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ স্তরে নারীদের ভূমিকা অনেকটাই সীমিত। তারা অধিকাংশ সময় সাংগঠনিক, মহিলা বিষয়ক বা প্রটোকল দায়িত্বে থাকেন। দলের শীর্ষ পর্যায়ে খুব কম সংখ্যক নারী উপদেষ্টা, যুগ্ম মহাসচিব বা কেন্দ্রীয় মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেন।
এছাড়া স্থানীয় রাজনীতিতে নারী কাউন্সিলর, ইউপি চেয়ারম্যান বা জেলা কমিটির নেত্রীদের কার্যকর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাদের অনেকেই পেছন থেকে পুরুষ নেতাদের দ্বারা পরিচালিত হন—এটি একটি ওপেন সিক্রেট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নারী রাজনীতিকরা এখনো অনেক বাধার সম্মুখীন হন—পারিবারিক বাধা, সামাজিক সমালোচনা, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক সহিংসতা ও হুমকি তাদের সামনে প্রতিদিনের বাস্তবতা। নারী প্রার্থীদের নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে হেনস্থা, ট্রল, কিংবা মানসিক নিপীড়ন আজও রোধ হয়নি।
তবে পরিবর্তনও হচ্ছে। নতুন প্রজন্মের অনেক শিক্ষিত, সোচ্চার, ও গণমাধ্যম-সচেতন নারী রাজনীতিতে আসছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার, নারী নেতৃত্বে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, এবং রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নারীদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের ভূমিকা নিয়ে গর্ব করার মতো দৃষ্টান্ত যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে গভীর অসাম্য ও চ্যালেঞ্জের বাস্তবতাও। এখন দরকার প্রতীকী প্রতিনিধিত্ব থেকে কার্যকর অংশগ্রহণে রূপান্তর। নারীদের শুধু উপস্থিতিই যথেষ্ট নয়—তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, স্বাধীনতা, এবং নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
একটি সমাজ, একটি রাষ্ট্র, তখনই সত্যিকারের প্রগতিশীল হতে পারে—যখন সেই সমাজের নারীরা কণ্ঠস্বর হারিয়ে নয়, বরং নিজেদের অবস্থান তৈরি করে, নেতৃত্ব দেয়। বাংলাদেশ সেই পথেই এগোচ্ছে, তবে গন্তব্য এখনো বহু দূর।