মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান ব্র্যাড কুপার জানিয়েছেন, ইরানে চলমান সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৫০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। এছাড়া অভিযানে ২০০টি যুদ্ধবিমান, দুটি বিমানবাহী রণতরী এবং কয়েকটি বোমারু বিমান অংশগ্রহণ করছে।
কুপারের মতে, এটি মধ্যপ্রাচ্যে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতি। তিনি বলেন, লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, বিশেষ করে যেসব থেকে হামলার আশঙ্কা রয়েছে। ইরানের নৌবাহিনীর কার্যক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে এবং তাদের প্রধান সাবমেরিন ধ্বংস করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, এখন পর্যন্ত ১৭টি ইরানি জাহাজ ধ্বংসের দাবি করা হয়েছে। সমুদ্র, আকাশ ও সাইবার স্পেস—তিনটি ক্ষেত্রেই অব্যাহত অভিযান চলছে। সেন্টকম প্রধানের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ইরানকে কার্যকরভাবে প্রতিহত করা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা রক্ষা করা।
ইরানের রাজনৈতিক উচ্চপদস্থ নেতা মোহাম্মদ মোখবার স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের কূটনৈতিক আলোচনা চালাতে আগ্রহী নয়। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “ওয়াশিংটনের প্রতি আমাদের কোনো আস্থা নেই, আর তাদের সঙ্গে আলোচনা চালানোর কোনো ভিত্তি নেই।” ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনরত মোখবার আরও জানান, তেহরান প্রয়োজনে ‘যতদিন দরকার’ চলমান সংঘাতের মধ্যেই অবস্থান বজায় রাখতে প্রস্তুত। তাঁর মন্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ইরান কোনো আংশিক সমঝোতা বা আলোচনার পথ গ্রহণ করবে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, মোখবারের এই অবস্থান মার্কিন নেতৃত্বাধীন প্রতিক্রিয়ার সীমাবদ্ধতার দিকে ইঙ্গিত করছে এবং ইরানের কৌশলগত স্থিতিশীলতা ও সামরিক প্রস্তুতি আরও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের দিকে নির্দেশিত হতে পারে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ঘোষণা করেছে যে বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত নৌপথ, হরমুজ প্রণালি, এখন সম্পূর্ণভাবে তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বুধবার (৪ মার্চ) ফার্স নিউজের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, নৌবাহিনী এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে এবং যেকোনো চলাচলরত জাহাজ এখন ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আইআরজিসির নৌ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আকবরজাদেহ সতর্ক করে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে যেকোনো তেলবাহী জাহাজ চলাচল করলে তা সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্য হতে পারে। এ ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তেজনা তুঙ্গে রয়েছে। এর ঠিক এক দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চলাচলরত তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোকে সুরক্ষার জন্য মার্কিন নৌবাহিনী এসকর্ট দিতে প্রস্তুত। মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই তাদের কূটনৈতিক কর্মীদের জন্য সতর্কতা জারি করেছে। সৌদি আরব, ওমান এবং সাইপ্রাসে অবস্থানরত দূতাবাসের কর্মকর্তা ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা কারণে স্থানান্তরের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও নৌ-পরিবহনকে মারাত্মক অনিশ্চয়তার মুখে ফেলতে পারে এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে আনুষ্ঠানিক পরিবর্তন ঘটেছে। দেশটির প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি–এর মৃত্যুর পর তার পুত্র মোজতবা খামেনি–কে নতুন সুপ্রিম লিডার হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সংবিধানসম্মত প্রক্রিয়ার আওতায় ‘এসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ক্ষমতাসীন নিরাপত্তা কাঠামো, বিশেষত বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)–এর প্রভাব এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে; যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। ১৯৬৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মাশহাদে জন্মগ্রহণকারী মোজতবা খামেনি দীর্ঘদিন ধরে ‘অফিস অব দ্য সুপ্রিম লিডার’-এর কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ধর্মীয় শিক্ষা ও সামরিক কাঠামোর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে তিনি ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার বলয়ে প্রভাবশালী হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিলেন। তার নেতৃত্ব গ্রহণের সময় ইরান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে অবস্থান করছে। নতুন সুপ্রিম লিডার হিসেবে তিনি এখন সংবিধান নির্ধারিত ক্ষমতা ও দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় আনুষ্ঠানিকভাবে অবতীর্ণ হলেন।