ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বুধবার (০৪ মার্চ) হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, তেহরানে খামেনির মৃত্যুর পর যে ব্যক্তিকেও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হবে, তাকে হত্যা করা হবে।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক পোস্টে উল্লেখ করেন, যেকোনো নেতা যদি ইসরায়েলকে ধ্বংস, যুক্তরাষ্ট্র বা আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্য হুমকি সৃষ্টি করে এবং ইরানি জনগণকে দমন-নিপীড়নের পরিকল্পনা এগিয়ে নেয়, তার নাম এবং অবস্থান যেখানেই হোক না কেন, তাকে নিশানা বানানো হবে।
এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক মহলে উত্তেজনা তীব্রতর হয়েছে, এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই ঘোষণা গুরুত্বসহকারে পর্যবেক্ষণ করছে।
ইরানকে ঘিরে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তীব্র মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে, যেখানে যুদ্ধনীতি নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন কমালা হ্যারিস। শনিবার (১৮ এপ্রিল) এক তহবিল সংগ্রহ অনুষ্ঠানে তিনি অভিযোগ করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু-এর প্রভাবে এমন এক সংঘাতে জড়িয়েছেন, যা মার্কিন জনগণের প্রত্যাশার পরিপন্থী এবং দেশটির সেনাসদস্যদের ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এ বিষয়ে সরাসরি প্রতিক্রিয়া না জানালেও ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন জানিয়ে মন্তব্য করেন যে, দেশটি কঠিন পরিস্থিতিতেও কৌশলগত সক্ষমতা ও দৃঢ়তার পরিচয় দিচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও সম্ভাব্য সামরিক সম্পৃক্ততা নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে, যা ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ঘিরে কৌশলগত উপস্থিতি জোরদারে নতুন করে নৌ-সামরিক শক্তি প্রদর্শনে নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’-কে লোহিত সাগরে পুনরায় মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিরক্ষা সূত্র। পেন্টাগনের কর্মকর্তাদের বরাতে জানা যায়, পূর্ব ভূমধ্যসাগর থেকে যাত্রা করে রণতরিটি সুয়েজ খাল অতিক্রম করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগর অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। এর সঙ্গে রয়েছে সশস্ত্র ডেস্ট্রয়ার ‘ইউএসএস মাহান’ এবং ‘ইউএসএস উইনস্টন এস চার্চিল’, যা সম্মিলিতভাবে একটি শক্তিশালী ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ গঠন করেছে। এর আগে রক্ষণাবেক্ষণ ও অগ্নিকাণ্ডজনিত ক্ষয়ক্ষতির কারণে কিছু সময়ের জন্য মেরামতে থাকলেও এখন পূর্ণ সক্ষমতায় পুনরায় অপারেশনাল অবস্থায় ফিরেছে রণতরিটি। বর্তমানে অঞ্চলে ইতোমধ্যে সক্রিয় রয়েছে আরেকটি মার্কিন রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’, আর তৃতীয় ক্যারিয়ার ‘ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ’ ও অগ্রসরমান। ফলে অদূর ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে ঘিরে চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধমূলক সক্ষমতা জোরদার করতেই যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের শক্তি প্রদর্শনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনার মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান অনির্দিষ্টকালের জন্য তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত রাখতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত নিরসনে একটি চূড়ান্ত চুক্তি প্রায় সম্পন্নের পথে রয়েছে, যদিও এর শর্তাবলি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন ইরানের কোনো স্থগিত (ফ্রোজেন) অর্থ মুক্ত করা হবে না, যা সম্ভাব্য চুক্তির আর্থিক দিক নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পৃথক বার্তায় ট্রাম্প উল্লেখ করেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত থাকলেও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ বহাল থাকবে এবং তা চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যাহার করা হবে না। উল্লেখযোগ্য যে, ইরানের পক্ষ থেকেও সীমিত শর্তে সামুদ্রিক পথ উন্মুক্ত করার ইঙ্গিত এসেছে। তবে চলমান আলোচনার প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক অবস্থান ও পারস্পরিক বাধ্যবাধকতা এখনও চূড়ান্ত হয়নি, ফলে পরিস্থিতি আইনগত ও কূটনৈতিকভাবে অনির্ধারিত অবস্থায় রয়েছে।