ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর ৪০ দিন পূর্তি উপলক্ষে আনুষ্ঠানিক শোকবার্তা প্রদান করেছেন দেশটির বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি অভিযোগ করেন, সমন্বিত সামরিক হামলার মাধ্যমে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের শামিল।
বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে সংঘটিত হামলায় খামেনির মৃত্যু ঘটে, যা ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত। একই সঙ্গে তিনি এ ঘটনাকে ‘ইসলামি উম্মাহর বিরুদ্ধে আগ্রাসন’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আরও বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক শান্তির জন্য হুমকিস্বরূপ। তিনি জনগণকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রীয় ঐক্য ও প্রতিরোধ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, শোকাবহ এই সময়কে কেন্দ্র করে দেওয়া বক্তব্যটি মূলত অভ্যন্তরীণ সংহতি সুদৃঢ় করা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করার কৌশলগত প্রয়াস।
দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে যুদ্ধ সমর্থনে উল্লেখযোগ্য পতন দেখা যাচ্ছে বলে একাধিক জরিপে উঠে এসেছে। ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউট (আইডিআই)-এর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর সময় জনমতের বড় অংশ সমর্থন দিলেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ করে ইহুদি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমর্থন দ্রুত হ্রাস পেয়েছে। জরিপে দেখা যায়, শুরুতে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ ইসরায়েলি যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিলেও বর্তমানে সেই হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। একইসঙ্গে আরব জনগোষ্ঠীর অবস্থান তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও সামগ্রিকভাবে সমর্থন কাঠামোয় পরিবর্তন স্পষ্ট। নিরাপত্তা বিশ্লেষণ ও জনমত জরিপে আরও উঠে এসেছে, যুদ্ধের লক্ষ্য ও ফলাফল নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংশয় তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান, ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা এবং দৈনন্দিন জীবনের বিঘ্ন জনমনে ক্লান্তি সৃষ্টি করেছে। ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ (আইএনএসএস)-এর পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব লক্ষ্য নিয়ে জনসমর্থন ছিল, সময়ের সঙ্গে সেগুলোর প্রতি আস্থা কমেছে। বিশেষ করে প্রতিপক্ষের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন বা সম্পূর্ণ সামরিক বিজয়ের প্রত্যাশা আগের তুলনায় অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘায়িত সংঘাত সাধারণত জনমতকে যুদ্ধবিরতির দিকে ঠেলে দেয়—ইসরায়েলের ক্ষেত্রেও এখন সেই প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে, যেখানে দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে মতামত ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ঘোষিত শর্তসাপেক্ষ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার ২৪ ঘণ্টা পূর্ণ হওয়ার আগেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। বুধবার (৮ এপ্রিল) লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর ব্যাপক সামরিক অভিযানে অন্তত ২৫৪ জন নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। উক্ত হামলার প্রেক্ষিতে লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হেজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থানে রকেট হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে। গোষ্ঠীটি তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে উল্লেখ করে, লেবাননের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক আগ্রাসন অব্যাহত থাকলে প্রতিরোধমূলক আক্রমণ অব্যাহত থাকবে। এদিকে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সতর্ক করে জানিয়েছে, ইসরায়েল যদি আক্রমণ বন্ধ না করে, তবে আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে কঠোর ও প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলেও, তা বাস্তবায়ন নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ইসরায়েল, ইরান ও মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে এ চুক্তি নিশ্চিত করলেও লেবানন এই সমঝোতার আওতায় রয়েছে কি না, তা নিয়ে পক্ষগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য বিরাজ করছে। ইসরায়েল দাবি করেছে, মাত্র ১০ মিনিটে লেবাননের প্রায় ১০০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে, যা তারা সামরিক প্রয়োজনীয়তার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। অপরদিকে, ইরান এ ধরনের পদক্ষেপকে যুদ্ধবিরতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ অভিযানে হেজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ‘সবচেয়ে বড় আঘাত’ হানার দাবি করে বলেন, প্রয়োজনে ইরানের বিরুদ্ধেও পুনরায় সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অন্যদিকে, ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ অভিযোগ করেন, তেহরানের প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতির একাধিক ধারা ইতোমধ্যে প্রকাশ্যে লঙ্ঘিত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে চলমান আলোচনা ও সমঝোতা অব্যাহত রাখাকে তিনি ‘অযৌক্তিক’ বলে মন্তব্য করেন। সর্বশেষ পরিস্থিতিতে, যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বুধবার (৭ এপ্রিল) ঘোষণা করেছেন, তার দেশের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও তাদের মিত্ররা লেবাননসহ সব প্রান্তে অবিলম্বে কার্যকর দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। ইসলামাবাদে আগামী শুক্রবার দু’দেশের প্রতিনিধিদলকে বৈঠকের জন্য স্বাগত জানানো হবে, যেখানে চূড়ান্ত সমঝোতার আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। শাহবাজ আশা প্রকাশ করেছেন যে, এই ‘ইসলামাবাদ আলোচনা’ টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় কার্যকর হবে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছে, তার দেশ এই যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত নয় এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখবে। নেতানিয়াহু স্পষ্ট করেছেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের লক্ষ্য ইরানকে এমন অবস্থানে নিয়ে আসা যাতে তারা পারমাণবিক, ক্ষেপণাস্ত্র বা সন্ত্রাসী হুমকি তৈরি করতে না পারে। যদিও ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যকে সমর্থন জানাচ্ছে, তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে লেবাননের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে কোনও ছাড় নেই। এই অবস্থার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ কঠিন হয়ে উঠেছে, যেখানে ইসলামাবাদে আসন্ন আলোচনাই সম্ভাব্য সমাধানের মূল কেন্দ্রে রয়ে যাচ্ছে।