যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির মধ্যেও স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, চুক্তির শর্তাবলী পুরোপুরি মেনে না চললে পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বিবৃতিতে ট্রাম্প জানান, মধ্যপ্রাচ্য ও ইরানের চারপাশে মোতায়েন সব মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, বিমান ও সরঞ্জাম আগের অবস্থানে থাকবে এবং সর্বদা পূর্ণ প্রস্তুত থাকবে।
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে দুই সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতির সময়ে তেহরানের ওপর চাপ বজায় রাখার কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেছেন, ইরান যদি চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র এমন আক্রমণ করবে যা আগে কখনো বিশ্বের কেউ দেখেনি। তিনি আরও জানান, ইরানের সামরিক শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, কিন্তু মার্কিন বাহিনী ও অতিরিক্ত গোলাবারুদ যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত।
প্রেসিডেন্টের বিবৃতিতে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাম্পের দাবি, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না এবং চুক্তির শর্তাবলী মানা না হলে শান্তিকালীন বিরতি শেষে পুনরায় ‘লড়াকু অভিযান’ শুরু হবে।
এ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের শর্তসাপেক্ষ যুদ্ধবিরতি পাকিস্তান ও ইরানের উদ্যোগে ইসলামাবাদে আগামী ১০ এপ্রিল অনুষ্ঠিতব্য শান্তি আলোচনার প্রেক্ষাপটেও সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ইরানকে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য করার একটি শক্তিশালী আল্টিমেটাম হিসেবে কাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে আগামী সপ্তাহে লেবাননের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক শান্তি আলোচনা শুরুর আগ্রহ প্রকাশ করেছে ইসরায়েল। তবে এই আলোচনায় হিজবুল্লাহকে কোনোভাবেই অন্তর্ভুক্ত করা হবে না বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত মাইকেল লেটার। তিনি বলেন, হিজবুল্লাহর অব্যাহত হামলা শান্তি প্রক্রিয়ার প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে রয়ে গেছে এবং এ সংগঠনকে আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে। এদিকে কূটনৈতিক সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও লেবাননের রাষ্ট্রদূতদের মধ্যে টেলিফোনে যোগাযোগ হয়েছে, যেখানে উত্তেজনা প্রশমন ও সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির কাঠামো নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়। লেবাননের প্রেসিডেন্ট কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আসন্ন বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের সীমান্ত উত্তেজনা ও যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত বিষয়গুলো আলোচনায় আসবে।
ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি সংলাপকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল পাকিস্তানের উদ্দেশে যাত্রা করেছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে গঠিত এই প্রতিনিধি দল আলোচনায় অংশ নিতে ইসলামাবাদে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। যাত্রার পূর্বে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে ভ্যান্স জানান, ইরান যদি সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা নিয়ে আলোচনায় অংশ নেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র গঠনমূলক সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রতারণামূলক কৌশল গ্রহণ করা হলে মার্কিন পক্ষ কঠোর অবস্থান নেবে এবং আলোচনায় কোনো ধরনের নমনীয়তা দেখানো হবে না। প্রতিনিধিদলে সাবেক উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। অতীতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনে তাদের সম্পৃক্ততা এই সংলাপের কৌশলগত গুরুত্বকে আরও জোরালো করেছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও শর্তসাপেক্ষ অবস্থানের মধ্যেই এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
হরমুজ প্রণালির আকাশসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর একটি এমকিউ–৪সি ট্রাইটন নজরদারি ড্রোন রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়েছে। শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সংঘটিত এ ঘটনায় ড্রোনটি বিধ্বস্ত হয়েছে নাকি কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপে ভূপাতিত হয়েছে—তা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, পারস্য উপসাগর এলাকায় নির্ধারিত নজরদারি মিশন শেষে ঘাঁটিতে ফেরার পথে ড্রোনটি জরুরি সংকেত (‘কোড ৭৭০০’) প্রেরণ করে এবং দ্রুত উচ্চতা হারাতে থাকে। পরবর্তীতে এর সঙ্গে সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। উল্লেখযোগ্য যে, ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই সংঘটিত হয়েছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের এই কৌশলগত নজরদারি প্ল্যাটফর্মটির নিখোঁজ হওয়া সামরিক ও কূটনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।