ইরানে চলমান নজিরবিহীন বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে জল্পনা বাড়লেও বিশ্লেষকেরা বলছেন, সীমিত বা আকস্মিক বিমান হামলায় দেশটির শাসনব্যবস্থার পতন ঘটার বাস্তব সম্ভাবনা নেই। কারণ, ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, বরং শক্তিশালী নেটওয়ার্কভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পারস্পরিকভাবে সংহত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ড, গোয়েন্দা সংস্থা, ধর্মীয় নেতৃত্ব ও অর্থনৈতিক বলয়ের সমন্বিত কাঠামো বড় ধরনের বাহ্যিক চাপও সামাল দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। ফলে নেতৃত্ব বা নির্দিষ্ট স্থাপনায় হামলা শাসন পরিবর্তনের বদলে অভ্যন্তরীণ সংহতি আরও জোরদার করতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যে সামরিক হুমকি ও কূটনৈতিক ইঙ্গিতের দ্বৈততা স্পষ্ট হলেও এটিকে সুসংহত কৌশল নয়, বরং রাজনৈতিক চাপ ও সিদ্ধান্তহীনতার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা। আঞ্চলিক বাস্তবতায়ও যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প সীমিত—ইসরায়েল কঠোর অবস্থান চাইলেও সৌদি আরব, কাতার ও ওমান উত্তেজনা প্রশমনের পক্ষে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত লক্ষ্য শাসন উৎখাত নয়, বরং ইরানের আচরণে পরিবর্তন আনা—বিশেষত পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন ও আঞ্চলিক প্রভাব সীমিত করা। এ ক্ষেত্রে সামরিক হামলার চেয়ে লক্ষ্যভিত্তিক অর্থনৈতিক চাপ, কূটনীতি ও অভ্যন্তরীণ শক্তির ভারসাম্যে ফাটল তৈরিই তুলনামূলক কার্যকর পথ হতে পারে।
আইন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বাহ্যিক বলপ্রয়োগ সাধারণত রাষ্ট্রীয় সংহতি দুর্বল না করে বরং শক্তিশালী করে তোলে। ইরানে টেকসই পরিবর্তন আসতে পারে কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমেই।
ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযানের ষষ্ঠ দিনে দেশটিতে বিশাল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ তেহরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও কমান্ডারদের মধ্যে বহুজন নিহত হয়েছেন এবং মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজারের ওপরে পৌঁছেছে। হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিটের বরাতে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইরানের ২০টির বেশি নৌযান ডুবিয়ে ফেলেছে এবং ৪৯ জন শীর্ষ কর্মকর্তা হত্যা করেছে। এছাড়া, কুর্দি যোদ্ধারা ইরানের সীমান্ত অতিক্রম করে স্থল অভিযানে অংশগ্রহণ শুরু করেছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। হোয়াইট হাউসের বর্ণনা অনুযায়ী, ইরানের শাসনব্যবস্থা প্রায় চূর্ণবিচূর্ণ, এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, “আমরা যুদ্ধক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি করছি।” সংঘাতের এই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তা ও জ্বালানি বাজারের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজা আজ সন্ধ্যায় তেহরানে হওয়ার কথা থাকলেও তা স্থগিত করা হয়েছে। খবর জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও টাইমস অব ইসরায়েল। টেলিভিশনের বরাতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন প্রদেশ থেকে প্রচুর মানুষ জানাজায় অংশ নিতে আসার কারণে যথাযথ পরিকাঠামো ও আয়োজন নিশ্চিত করতে আরও সময় প্রয়োজন। তাই অনুষ্ঠানটি পরবর্তীতে উপযুক্ত সময়ে অনুষ্ঠিত হবে। খামেনির মৃত্যু গত সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ঘটে। তার মৃত্যুতে রাজধানী তেহরানসহ দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমেছে। নিরাপত্তা ও লজিস্টিক কারণে জানাজা স্থগিত করা হয়েছে। নতুন সময়সূচি পরে ঘোষণা করা হবে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বুধবার (০৪ মার্চ) হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, তেহরানে খামেনির মৃত্যুর পর যে ব্যক্তিকেও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হবে, তাকে হত্যা করা হবে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক পোস্টে উল্লেখ করেন, যেকোনো নেতা যদি ইসরায়েলকে ধ্বংস, যুক্তরাষ্ট্র বা আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্য হুমকি সৃষ্টি করে এবং ইরানি জনগণকে দমন-নিপীড়নের পরিকল্পনা এগিয়ে নেয়, তার নাম এবং অবস্থান যেখানেই হোক না কেন, তাকে নিশানা বানানো হবে। এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক মহলে উত্তেজনা তীব্রতর হয়েছে, এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই ঘোষণা গুরুত্বসহকারে পর্যবেক্ষণ করছে।