মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে নতুন দফার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে ইরান। দেশটির সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, সর্বশেষ অভিযানে হাইপারসনিকসহ মোট চার ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে এবং হামলার লক্ষ্য ছিল ইসরায়েল ও অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহর নিউজ এজেন্সি আইআরজিসির বরাতে জানায়, এ হামলাটি ছিল ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) পরিচালিত ৩৪তম দফার ক্ষেপণাস্ত্র অভিযান। এতে তিন ধরনের প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি একটি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির কাছে অবস্থিত আল-ধাফরা বিমান ঘাঁটি এবং বাহরাইনের জুফায়ার এলাকায় থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। এছাড়া ইসরায়েলের রামাত ডেভিড বিমান ঘাঁটি ও হাইফার বেসামরিক বিমানবন্দরেও লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
আইআরজিসির বিবৃতিতে আরও বলা হয়, তেল আবিবের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি গোপন ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ স্থাপনাতেও আঘাত হেনেছে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র। তবে এসব হামলার ফলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাধীন সূত্র থেকে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, ইরানের ওপর চলমান সামরিক অভিযানের তীব্রতা আজ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। মঙ্গলবার (১০ মার্চ) পেন্টাগনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আসন্ন হামলায় সর্বোচ্চ সংখ্যক যুদ্ধবিমান ও বোমারু বিমান ব্যবহার করা হবে। হেগসেথ বলেন, যুদ্ধ কতদিন চলবে তা সম্পূর্ণভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। তিনি বলেন, “এটা যুদ্ধের শুরু, মাঝামাঝি না শেষ—এ বিষয়ে মন্তব্য করা আমার দায়িত্ব নয়।” এর আগে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, যুদ্ধ খুব দ্রুত সমাপ্ত হতে পারে, তবে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করেননি। প্রতিনির্বাচনী অভিযোগে হেগসেথ উল্লেখ করেন, ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার স্কুল, হাসপাতাল ও বেসামরিক এলাকায় স্থাপন করছে, যাতে সেগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো কঠিন হয়। তবে সাম্প্রতিক ২৪ ঘণ্টায় ইরান তাদের সক্ষমতার তুলনায় ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা কমিয়েছে বলেও জানান তিনি। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বলেন, মার্কিন বাহিনীর প্রধান লক্ষ্য হলো ইরানের নৌবাহিনীর সক্ষমতা দুর্বল করা। এছাড়া সমুদ্রপথে মাইন ব্যবহার করে ইরানকে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার চেষ্টা বন্ধ করার জন্য অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিহত বা আহত হয়েছেন—এমন দাবি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লেও এখন পর্যন্ত এর পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বা সরকারি নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। ইরানের সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সি এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, সাম্প্রতিক ইরানি হামলার প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহু আহত বা নিহত হয়ে থাকতে পারেন। তবে ওই দাবির পক্ষে তারা কোনো নির্দিষ্ট তথ্য, দলিল বা আনুষ্ঠানিক সূত্র উপস্থাপন করতে পারেনি। প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে নেতানিয়াহুর নতুন ভিডিও প্রকাশ না হওয়া, তার বাসভবনের আশপাশে নিরাপত্তা জোরদার করা এবং কিছু কূটনৈতিক সফর স্থগিত হওয়াকে কেন্দ্র করে এ ধরনের জল্পনা তৈরি হয়েছে। উল্লেখ্য, তাসনিম নিউজ এজেন্সিকে সাধারণত ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)- ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগও সংস্থাটিকে আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। অন্যদিকে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম দ্য জেরুজালেম পোস্ট জানিয়েছে, নেতানিয়াহু নিহত বা আহত হয়েছেন—এমন দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। তাদের মতে, যুদ্ধকালীন নিরাপত্তাজনিত কারণে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রকাশ্য উপস্থিতি অনেক সময় সীমিত রাখা হয়ে থাকে। সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত ৭ মার্চ নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে একটি সরকারি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। এর আগের দিন, ৬ মার্চ, তাকে বিয়ারশেবার একটি এলাকা পরিদর্শনের সময়ও দেখা গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সবকিছু বিবেচনায় এখন পর্যন্ত বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিহত বা আহত হওয়ার দাবি কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত হয়নি।
চীনের অধ্যাপক জুয়েকিন জিয়াং-এর দুই বছর আগের পূর্বাভাস এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তিনি বেইজিংয়ে দর্শন ও ইতিহাস বিষয়ে পাঠদান করেন এবং ‘প্রেডিক্টিভ হিস্ট্রি’ বা ভবিষ্যদ্বাণীমূলক ইতিহাসের মাধ্যমে বৈশ্বিক রাজনীতি বিশ্লেষণ করেন। জিয়াং ২০২৪ সালের মে মাসে এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফিরবেন এবং ভূ-রাজনৈতিক চাপের কারণে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের পথে নামতে বাধ্য হবেন। এছাড়া তিনি জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই সংঘাতের ফলে দেশটি বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তার ওই অনলাইন বক্তৃতা সামাজিক মাধ্যমে পুনরায় ছড়িয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যেই দুইটি পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হয়েছে—ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ এবং ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার বৃদ্ধি। বাকি তৃতীয় পূর্বাভাসের ফলাফল বিশ্ববাসী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। জিয়াং বিশ্লেষণ করেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত কেবল সামরিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবেনা; এটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোরও সমালোচনামূলক ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতে পরিণত হতে পারে। তেহরান-ওয়াশিংটনের দ্বন্দ্ব আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটাবে এবং বিশ্ববাজারকে প্রভাবিত করবে। তিনি সম্প্রতি ‘ব্রেকিং পয়েন্টস’ সংবাদসিরিজে বলছেন, “ইরান যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় এই সংঘাতে বেশি প্রস্তুত এবং সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। দেশটি প্রায় দুই দশক ধরে এই মুহূর্তের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, আমার পূর্বাভাস অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতে পরাজিত হয়ে রাষ্ট্র হিসেবে ধ্বংস হবে কিনা।” এই বিশ্লেষণ বিশ্বরাজনীতির আগ্রহীদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা নতুন করে সতর্ক সংকেত দেখাচ্ছেন।