মধ্যপ্রাচ্য কূটনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়ে দিয়েছে, ইরান–যুক্তরাষ্ট্র এর মধ্যকার চলমান যুদ্ধবিরতির নির্ধারিত মেয়াদ রোববার (২৬ এপ্রিল) শেষ হতে যাচ্ছে, যা ইতোমধ্যে অবহিত করা হয়েছে ইসরায়েল-কে।
ইসরায়েলি গণমাধ্যম কান পাবলিক ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন–এর বরাতে জানা যায়, ওয়াশিংটন প্রশাসন তেল আবিবকে জানিয়েছে যে প্রেসিডেন্টের নির্ধারিত সময়সীমা অচিরেই শেষ হচ্ছে এবং এর মধ্যে ইরানের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতির সম্ভাবনা সীমিত।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দ্রুত একটি রাজনৈতিক বোঝাপড়ায় পৌঁছানোর ওপর জোর দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যকর সমঝোতা অর্জন নিয়ে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের একাংশের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্যপ্রবাহের অভাবে তারা কেবল গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ঘোষণার মাধ্যমেই ওয়াশিংটনের অবস্থান জানতে পারছেন, যা কূটনৈতিক বিভ্রান্তি তৈরি করছে।
এর আগে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ সাময়িকভাবে বৃদ্ধি করা হলেও তা ছিল শর্তসাপেক্ষ, যেখানে তেহরানকে একটি গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব উপস্থাপনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। কিন্তু বর্তমান অগ্রগতির অভাবে আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে যদি কোনো সমঝোতা না হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলমান থাকলেও ওয়াশিংটন–তেহরান আস্থাহীনতা এখন প্রধান অন্তরায় হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অভিবাসন নীতি ফের আলোচনায় এসেছে, যেখানে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি বিতর্কিত পোস্ট শেয়ার করে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছেন। শেয়ার করা ওই কনটেন্টে রেডিও সঞ্চালক মাইকেল সেভেজ ভারত ও চীনসহ কয়েকটি দেশকে অবমাননাকর ভাষায় উল্লেখ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নীতিকে কেন্দ্র করে কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন, এসব দেশ থেকে কিছু ব্যক্তি সন্তান জন্মের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে নাগরিকত্ব সুবিধা গ্রহণ করছে—যা তিনি নীতিগত অপব্যবহার হিসেবে অভিহিত করেন। এই বক্তব্যে আরও বলা হয়, অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব অর্জন করছে এবং পরবর্তীতে পারিবারিক পুনর্মিলনের মাধ্যমে অন্যান্য সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসছে—যা নিয়ে তিনি আইন সংশোধনের আহ্বান জানান। উল্লেখ্য, ট্রাম্প এর আগের এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব ব্যবস্থাকে একক ব্যতিক্রম হিসেবে দাবি করলেও আন্তর্জাতিক তথ্য অনুযায়ী বিষয়টি সঠিক নয়; বিশ্বের বহু দেশে এ ধরনের আইন প্রচলিত রয়েছে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর ভারত ও চীনসহ বিভিন্ন দেশে কূটনৈতিক ও সামাজিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা একে ‘বিদ্বেষমূলক বয়ান’ হিসেবে অভিহিত করে সতর্ক করেছেন যে, এ ধরনের বক্তব্য বৈশ্বিক কূটনৈতিক সম্পর্ক ও অভিবাসন নীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অভিবাসন ইস্যুকে কেন্দ্র করে এই ধরনের বক্তব্য নির্বাচনি কৌশলের অংশ হলেও তা আন্তর্জাতিক আইনগত ও কূটনৈতিক পরিসরে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হলেও আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও অর্থবাজারে অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে। বরং প্রত্যাশিত স্বস্তির পরিবর্তে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে পতন দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, পাকিস্তানের অনুরোধে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির সময় বাড়ানো হয়েছে। তবে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ বহাল রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ঘোষণার পরপরই বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া না এসে উল্টো অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বাড়ে। এর প্রভাব পড়ে ওয়াল স্ট্রিটে। মঙ্গলবার এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ০.৬ শতাংশ কমে যায়। একই সঙ্গে ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ প্রায় ২৯৩ পয়েন্ট এবং নাসডাক কম্পোজিট সূচকও নিম্নমুখী হয়। অন্যদিকে জ্বালানি বাজারে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক মানের ব্রেন্ট ক্রুড তেল দিনের শুরুতে নিম্নমুখী থাকলেও পরে দ্রুত বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৮.৪৮ ডলারে পৌঁছায়, যা আগের দিনের তুলনায় তিন শতাংশের বেশি বৃদ্ধি। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বন্দর অবরোধ এবং ভবিষ্যৎ সংঘাতের শঙ্কাই বাজারে চাপ তৈরি করছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা থেকেই শেয়ারবাজারে পতন ও তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা দিচ্ছে।
ইরানকে ঘিরে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তীব্র মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে, যেখানে যুদ্ধনীতি নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন কমালা হ্যারিস। শনিবার (১৮ এপ্রিল) এক তহবিল সংগ্রহ অনুষ্ঠানে তিনি অভিযোগ করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু-এর প্রভাবে এমন এক সংঘাতে জড়িয়েছেন, যা মার্কিন জনগণের প্রত্যাশার পরিপন্থী এবং দেশটির সেনাসদস্যদের ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এ বিষয়ে সরাসরি প্রতিক্রিয়া না জানালেও ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন জানিয়ে মন্তব্য করেন যে, দেশটি কঠিন পরিস্থিতিতেও কৌশলগত সক্ষমতা ও দৃঢ়তার পরিচয় দিচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও সম্ভাব্য সামরিক সম্পৃক্ততা নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে, যা ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।