মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র সংঘাতের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রথম হামলার সময় ইরানের নবনিযুক্ত সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি গুরুতর আঘাতগ্রস্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদপত্র দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।
৫৬ বছর বয়সী খামেনি সম্প্রতি তার পিতা আলী খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। প্রতিবেদনে ইরানি ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, হামলার প্রথম দিনেই তার পায়ে আঘাত লেগেছে।
বর্তমানে মোজতবা খামেনি কোথায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন বা শারীরিক অবস্থার প্রকৃত তথ্য কী, তা প্রকাশ করা হয়নি। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শারীরিক সমস্যার কারণে তিনি জনসমক্ষে বা টেলিভিশনে ভাষণ দিতে অনুপস্থিত থাকায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন সীমিত হতে পারে।
এ ঘটনায় ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামরিক মনোবলে প্রভাব পড়তে পারে। তেহরানের রাস্তায় তার ছবি ও ব্যানার থাকা সত্ত্বেও নেতৃত্বের অনুপস্থিতি সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তার শারীরিক অবস্থার ওপর নিবিড় নজর রাখছে বলে জানা গেছে।
ওয়াশিংটনে গুলিবর্ষণ-পরবর্তী পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট পদকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। স্থানীয় সময় শনিবার (২৫ এপ্রিল) ওয়াশিংটনের একটি হোটেলে সংবাদমাধ্যমের নৈশভোজ চলাকালে গুলির ঘটনা ঘটার পরপরই আয়োজিত ব্রিফিংয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। হোয়াইট হাউসের ব্রিফিংয়ে নিজের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সহিংসতা প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, তিনি বিষয়টি নিয়ে সচেতন থাকলেও আতঙ্কিত নন। তাঁর ভাষায়, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা একটি ঝুঁকিপূর্ণ পেশা, যেখানে বিপদের আশঙ্কা অস্বাভাবিক নয়। পরিস্থিতি নিয়ে হালকা মন্তব্য করে তিনি বলেন, এ পদটি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ আগে জানলে হয়তো তিনি নির্বাচনেই অংশ নিতেন না। তবে পরক্ষণেই তিনি বলেন, দায়িত্ব পালনই মূল উদ্দেশ্য এবং দেশসেবার অঙ্গীকার থেকেই তিনি কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন মেলানিয়া ট্রাম্প। নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্র সিক্রেট সার্ভিস তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়। ট্রাম্প আরও বলেন, ঘটনাস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হোটেলটি সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিল না—এ বিষয়টিও পর্যালোচনায় এসেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। উল্লেখ্য, হোয়াইট হাউস সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের ওই নৈশভোজ চলাকালীন হঠাৎ গুলির শব্দে অনুষ্ঠানস্থলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, যা পরে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রণে আসে।
দীর্ঘ বিরতির পর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে গাজা উপত্যকা-এ, যেখানে স্থানীয় নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন বাসিন্দারা। শনিবার (২৫ এপ্রিল) রয়টার্স-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়, প্রায় দুই দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো গাজার কিছু এলাকায় স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেইর আল-বালাহ শহরকে প্রতীকীভাবে অন্তর্ভুক্ত করে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে অঞ্চলে তাদের প্রশাসনিক উপস্থিতি ও কর্তৃত্বের দাবি আরও সুসংহত করা হচ্ছে। ২০০৭ সালে হামাস গাজার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর দীর্ঘ সময় ভোটাধিকার চর্চা সীমিত ছিল। এবারের নির্বাচনে বিদ্যুৎ সংকট ও অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে কিছু কেন্দ্র তাঁবুতে স্থাপন করা হয়েছে এবং ভোটগ্রহণের সময়ও সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় প্রায় ৭০ হাজারসহ মোট ১০ লাখের বেশি ভোটার অংশ নেওয়ার যোগ্য। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে অঞ্চলটির সব এলাকায় ভোট আয়োজন সম্ভব হয়নি, যার ফলে নির্বাচন আংশিকভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই স্থানীয় নির্বাচন ভবিষ্যতে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও সম্ভাব্য জাতীয় নির্বাচনের পথ খুলে দিতে পারে। তবে রাজনৈতিক বিভাজন ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ না থাকায় নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তাও রয়ে গেছে।
আঞ্চলিক সামুদ্রিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা ঘিরে দ্বিমুখী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে—একদিকে ইরান দাবি করেছে তাদের একটি পণ্যবাহী জাহাজ সফলভাবে নজরদারি এড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছেছে, অন্যদিকে পৃথক অভিযানে একটি তেলবাহী জাহাজ জব্দ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের রাষ্ট্রীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, চালবাহী জাহাজটি হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকালে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী-এর নৌ ইউনিটের নিরাপত্তা সহায়তায় ওমান সাগর হয়ে নিরাপদে বন্দরে পৌঁছে। এ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ জানায়, ভারত মহাসাগরে পৃথক সামরিক অভিযানে ‘ম্যাজেস্টিক এক্স’ নামের একটি ইরান-সংশ্লিষ্ট তেলবাহী জাহাজ জব্দ করা হয়েছে। পেন্টাগনের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন ও তেল পাচার প্রতিরোধে সমুদ্রপথে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং প্রয়োজনবোধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত থাকবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগকে ঘিরে নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।