মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাত অবসানে তিনটি মৌলিক শর্তের কথা তুলে ধরেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি জানিয়েছেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও যুদ্ধবিরতির পথে অগ্রসর হতে হলে ইরানের ন্যায্য অধিকার স্বীকৃতি, যুদ্ধজনিত ক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং ভবিষ্যতে কোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন না করার আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে হবে।
বুধবার (১১ মার্চ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম X (Twitter)–এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি এসব শর্তের কথা উল্লেখ করেন। সেখানে তিনি বলেন, তেহরান বরাবরই আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে; তবে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটাতে হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে ইরানের অধিকার ও নিরাপত্তা উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
পোস্টে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান জানান, এ বিষয়ে তিনি রাশিয়া ও পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গেও আলোচনা করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান সংঘাত ‘জায়নবাদী শাসনব্যবস্থা’ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্ররোচনার ফল। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ না নেওয়ার কার্যকর আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি ছাড়া টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পর থেকে অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। পরিস্থিতি প্রশমনে বিভিন্ন কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার হলেও এখনো স্থায়ী সমাধানের পথ সুস্পষ্ট হয়নি। এ প্রেক্ষাপটে রাশিয়া ইরানের নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রেখে সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়ে আসছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইরানকে লক্ষ্য করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বিত হামলা বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) পর্যন্ত টানা ১৩ দিনে গড়িয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের ফলে ইরানে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৭০০ ছাড়িয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও বহু মানুষ। বর্তমান পরিস্থিতিতে সংঘাত বন্ধের কোনো স্পষ্ট কূটনৈতিক অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। এ প্রেক্ষাপটে ইরান নতুন করে সতর্কবার্তা দিয়েছে যে চলমান সামরিক সংঘাত শিগগিরই “নতুন পর্যায়ে” প্রবেশ করতে পারে। আল জাজিরাকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রাখে, তবে আঞ্চলিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে এবং সংঘাতের বিস্তৃতি বাড়তে পারে। তিনি আরও ইঙ্গিত দেন যে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোর নিরাপত্তা ভবিষ্যতে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। যদিও কোন প্রণালির কথা বলা হয়েছে তা স্পষ্ট করা হয়নি, তবে কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী তেহরানের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ইরানি ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, চলমান সংকট মোকাবিলায় তাদের হাতে এখনও একাধিক কৌশলগত বিকল্প রয়েছে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী সেগুলো প্রয়োগ করা হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সামরিক সংঘাত বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) পর্যন্ত টানা ১৩ দিনে গড়িয়েছে। চলমান এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ইরানে নিহতের সংখ্যা এক হাজার ৭০০ ছাড়িয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও বহু মানুষ। তবে অব্যাহত প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেও সংঘাত বন্ধের কোনো সুস্পষ্ট ইঙ্গিত এখনো পাওয়া যায়নি। সংঘাতের প্রথম দিনেই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর বড় ধরনের আঘাত হানা হয়। ওই হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ অন্তত ৪৮ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিহত হন বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ওই অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের নেতৃত্বকে অচল করে দিয়ে দ্রুত রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি করা। তবে প্রায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধের পরও ইরানের শাসনব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যায়নি। ফলে পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের সামরিক কৌশলে নতুন পরিকল্পনা বা ‘প্ল্যান বি’ বিবেচনায় নিচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংঘাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আলোচিত হলেও কার্যত কৌশলগত নেতৃত্বে রয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ইরানের শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করতে শুরুতে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্ব ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের টার্গেট করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, তবে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি। এদিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনিকে দায়িত্ব দেওয়ার পর দেশটির ক্ষমতার কাঠামো দ্রুত পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, নেতৃত্বে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য বিকল্প নেতৃত্ব কাঠামোও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন কৌশলের অংশ হিসেবে ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বাড়ানোর লক্ষ্যে সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিদ্যমান অসন্তোষকে কাজে লাগানোর সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে। পাশাপাশি অবকাঠামো ও কৌশলগত স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলার মাধ্যমে জনমনে চাপ সৃষ্টি করার কৌশলও আলোচনায় এসেছে। ইতোমধ্যে ইরানের বিভিন্ন অবকাঠামোতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি হামলার ঘটনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা। তবে ক্রমবর্ধমান এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার ওপর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইসরায়েলের সামাজিক সমতা বিষয়ক মন্ত্রী মে গোলান সোমবার নিউইয়র্কে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দেশ ছেড়ে যান। এ সময় দেশটির আকাশপথ প্রায় বন্ধ থাকায় সাধারণ নাগরিকরা বিদেশে যাতায়াত করতে পারছেন না। সাংবাদিক উরি মিসগাভ মন্ত্রীর বিজনেস ক্লাসের ফ্লাইটের ছবি প্রকাশ করে সফরের সত্যতা নিশ্চিত করেন। রোববার (৯ মার্চ) বেন গুরিওন বিমানবন্দর আংশিকভাবে খোলা হলেও প্রতি ঘণ্টায় মাত্র দুইটি ছোট বিমান চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, যাত্রী সংখ্যা ৭০–১০০ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই অবস্থায় মন্ত্রীর বিদেশি সফর রাজনৈতিক মহলে তীব্র সমালোচনা সৃষ্টি করেছে। বিরোধী দলীয় নেতা ভ্লাদিমির বেলিয়াক বলেছেন, সাধারণ মানুষের কষ্টের মধ্যে মন্ত্রীর বিজনেস ক্লাস ভ্রমণ দৃষ্টিকটু ও অসহনীয়।