রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র উত্তেজনার কারণে বিশ্বকে সতর্ক করে বলেছেন, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে পারমাণবিক সংঘাত এখন আর এড়ানো সম্ভব নয়।
তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপকে এই ‘প্রলয়ঙ্করী পরিস্থিতির মূল কারণ’ হিসেবে দায়ী করেছেন।
মেদভেদেভের মতে, ওয়াশিংটন প্রশাসন পারমাণবিক হুমকি নিয়ন্ত্রণের কথা বললেও, বাস্তবে তাদের পদক্ষেপ উত্তেজনাকে বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে। তিনি সতর্ক করেছেন, চলমান সামরিক অভিযানগুলো কোনো স্থায়ী সমাধান আনছে না, বরং অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্যকে ভঙ্গুর করে একটি ভয়াবহ ও অনিয়ন্ত্রিত উত্তেজনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, তেহরানের ওপর সামরিক হামলা ও শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্য এবার আর গোপন নয়, যা মধ্যপ্রাচ্যে সঙ্কটকে আরও জটিল করছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সামরিক অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় ইরানও মার্কিন ও ইসরায়েলি ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও বিস্তৃত ও বিপজ্জনক করেছে।
এই বিবৃতিটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মহলে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, কারণ পারমাণবিক অস্ত্রের সম্ভাব্য ব্যবহারকেই এখন বৈশ্বিক রাজনীতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরান এনপিটি থেকে বের হওয়ার বিকল্প খুঁজছে, পারমাণবিক ক্ষমতার ওপর কড়া আন্তর্জাতিক চাপের প্রেক্ষাপটে। পার্লামেন্টে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগায়ি জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন, দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র চায়নি এবং ভবিষ্যতেও চাওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। বাগায়ি প্রশ্ন তুলেছেন, “কেন এমন একটি চুক্তিতে থাকব, যেখানে অন্য রাষ্ট্ররা আমাদের অধিকার উপভোগ করতে দেয় না, বরং আমাদের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়?” তিনি জানিয়েছেন, ততদিন পর্যন্ত ইরান চুক্তির শর্ত মেনে চলবে, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা সদস্য। তবে চুক্তি ত্যাগ করলে কী প্রভাব পড়বে, সে বিষয়ে কোনো বিশদ জানাননি। এর আগে গত জুনে ১২ দিনের সংঘাতের সময় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরও ইরানি আইনপ্রণেতারা এনপিটি থেকে বের হওয়ার সম্ভাবনা উত্থাপন করেছিল। বর্তমানে সেই আলোচনা আবারও দেশের পার্লামেন্টে তীব্রভাবে শুরু হয়েছে।
ইরান কেন্দ্রিক মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাব ইতালি পর্যন্ত পৌঁছেছে। ইতালির প্রতিরক্ষা মন্ত্রী গুইডো ক্রোসেত্তো বলেছেন, তিনি চরম উদ্বেগ ও অনিদ্রার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন, কারণ যুদ্ধের সম্ভাব্য প্রভাব এবং গোপন কৌশলগত তথ্যের দায়িত্ব তার ঘুম কেড়ে নিয়েছে। ‘লা রিপাবলিকা’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্রোসেত্তো জানিয়েছেন, যুদ্ধ ও এর প্রভাব নিয়ে তিনি সার্বক্ষণিক চিন্তিত থাকেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সংঘাত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের রূপ নেয়, তবে জ্বালানি বাজারের প্রভাব প্রথমে অনুভূত হবে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে বিঘ্ন ঘটলে, এটি ইতালির আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। মন্ত্রী আরও বলেন, তার উদ্বেগ মূলত সাধারণ ইতালীয় নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবন ও অর্থনীতিকে রক্ষা করা নিয়ে। জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাত ও মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের রুটির আয়ের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। গত সপ্তাহে মার্কিন প্রশাসন ও ন্যাটোর উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ইতালি সক্রিয় অংশীদার হিসেবে উপস্থিত ছিল। কূটনীতিকরা মনে করছেন, ক্রোসেত্তোর উদ্বেগই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সামরিক ফ্রন্ট বা পারমাণবিক উত্তেজনার সম্ভাবনার প্রাথমিক ইঙ্গিত দিতে পারে।
মাসব্যাপী যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল–ইরান সংঘাতের প্রভাবে উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। যুদ্ধবিরতির আলোচনা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে জোরালো তৎপরতা থাকলেও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সামরিক অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে রোববার (২৯ মার্চ) পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে তুরস্ক, সৌদি আরব, মিসর ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের অংশগ্রহণে উচ্চপর্যায়ের একটি কূটনৈতিক বৈঠক শুরু হয়েছে। দুই দিনব্যাপী এই আলোচনায় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং চলমান সংঘাত নিরসনের সম্ভাব্য কৌশল নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই বৈঠকটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে সরাসরি সংলাপে আনতে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সমন্বিত আঞ্চলিক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের জন্য পুনরায় সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত করার বিষয়ে। প্রথম দিনের বৈঠক শেষে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেন, অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর প্রতিনিধিরা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের দ্রুত ও টেকসই সমাধান খুঁজতে সম্ভাব্য কূটনৈতিক পথগুলো নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংলাপের সম্ভাবনাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। এদিকে বৈঠক শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে প্রায় ৯০ মিনিটব্যাপী টেলিফোন আলাপ করেন, যা গত পাঁচ দিনের মধ্যে তাদের দ্বিতীয় যোগাযোগ। এই ধারাবাহিক কূটনৈতিক যোগাযোগ চলমান সংকট নিরসনে আঞ্চলিক উদ্যোগের গুরুত্বকে আরও জোরালো করে তুলেছে। সার্বিক পরিস্থিতি থেকে প্রতীয়মান হয়, সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতাও সমান্তরালভাবে এগিয়ে চলেছে, যেখানে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।