যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ঘোষিত ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতিকে নিজেদের কৌশলগত অর্জন হিসেবে উপস্থাপন করেছে হোয়াইট হাউজ। বুধবার (৮ এপ্রিল) একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এক বিবৃতিতে বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছে, যা পরবর্তীতে কূটনৈতিক আলোচনার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই সামরিক অগ্রগতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে শক্তিশালী দরকষাকষির সুযোগ তৈরি করে এবং তা সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ সুগম করেছে।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, আন্তর্জাতিক পরিসরে মার্কিন স্বার্থ সংরক্ষণ এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় ট্রাম্প প্রশাসনের সক্ষমতাকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে হলে ইরানকে হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ‘সম্পূর্ণ নিরাপদভাবে’ নিশ্চিত করতে হবে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মধ্যস্থতায় এই সমঝোতা গড়ে ওঠে। তাঁর দপ্তর জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট শর্ত মেনে ইরান হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করতে সম্মত হওয়ায় যুদ্ধবিরতি অবিলম্বে কার্যকর হওয়ার পথে রয়েছে।
১. আর কোনো আগ্রাসন নয়, যুক্তরাষ্ট্রকে অঙ্গীকার করতে হবে ২. হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে থাকবে ৩. ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার ইরানের থাকবে ৪. সব প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে ৫. দ্বিতীয় পর্যায়ের সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে ৬. নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের বিরুদ্ধে সব প্রস্তাব বাতিল করতে হবে ৭. আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সংস্থা (IAEA)-তে ইরানের বিরুদ্ধে সব প্রস্তাব বাতিল করতে হবে ৮. যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ইরানকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে ৯. মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সব সেনাকে প্রত্যাহার করতে হবে ১০. লেবাননসহ সব অঞ্চলে আক্রমণ বন্ধ করতে হবে সূত্র: তাসনিম নিউজ, ইরান
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা কমাতে তেহরান পেশ করল ১০ দফা শান্তি প্রস্তাব, পাকিস্তান মধ্যস্থতায় কাল হবে উচ্চপর্যায় বৈঠক। তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে স্থায়ীভাবে শিথিল করার লক্ষ্যে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার পর ১০ দফার বিস্তারিত শান্তি পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ফারস নিউজ জানিয়েছে, এই প্রস্তাব পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছানো হয়েছে। প্রস্তাবের মূল অংশে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে আদায়কৃত প্রায় ২০ লাখ ডলার ফি ওমানের সঙ্গে ভাগ করে দেশীয় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে ব্যবহার করার পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়া ইরান চায়, তার ওপর থেকে সব আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালির একক নিয়ন্ত্রণ স্বীকৃতি দিতে হবে। মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, ইরানি সম্পদ অবমুক্তকরণ এবং পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরির অঙ্গীকারও প্রস্তাবের শর্ত হিসেবে ধরা হয়েছে। ইরান আগামী দুই সপ্তাহের জন্য সীমিত আকারে ‘সেফ প্যাসেজ প্রোটোকল’ অনুযায়ী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেবে। পাশাপাশি যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটাতে বিশেষ বিনিয়োগ তহবিল গঠন ও আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে শান্তি চুক্তির সুযোগও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদিও ইরান শর্তগুলোতে কঠোর, তবে চূড়ান্ত সমঝোতার জন্য দুই পক্ষকেই কিছু ছাড় দিতে হবে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের নজর এখন কালকের ইসলামাবাদ হাই-প্রোফাইল বৈঠকের দিকে। সূত্র: আল জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান
ইরানের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় জনগণের সর্বোচ্চ ত্যাগের প্রস্তুতির কথা তুলে ধরে দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ নাগরিক দেশের জন্য জীবন উৎসর্গে প্রস্তুত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “আমি নিজেও ইরানের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছি এবং ভবিষ্যতেও করে যাব।” সরকারি সূত্র অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলি অভিযানে ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তিত্ব নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রাণহানি ও হতাহতের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, সংঘাত শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ২,০৭৬ জন নিহত এবং ২৬,৫০০ জন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করায় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।