আঞ্চলিক সংঘাতে তৃতীয় পক্ষের সম্পৃক্ততার অভিযোগে কূটনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপ জোরদার করেছে ইরান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সহায়তার অভিযোগ তুলে উপসাগরীয় পাঁচ রাষ্ট্র—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান—এর বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ দাবি উত্থাপন করেছে তেহরান।
জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি আমির সাঈদ ইরাভানি এক আনুষ্ঠানিক পত্রে আন্তোনিও গুতেরেস ও নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির কাছে অভিযোগ করেন, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করে প্রতিপক্ষকে সহযোগিতা করেছে, যার ফলে সৃষ্ট সামরিক সংঘাতে ক্ষয়ক্ষতির দায় তাদের ওপরও বর্তায়।
পত্রে ইরান স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে, আন্তর্জাতিক আইনের নীতিমালা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্র হিসেবে তারা আর্থিক ক্ষতিপূরণ দাবি করার অধিকার সংরক্ষণ করে। তবে এ বিষয়ে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
প্রসঙ্গত, দীর্ঘদিনের উত্তেজনার ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে ইরানের বিপুল অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনি বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত জলপথে উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে নতুন কূটনৈতিক ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, চলমান আলোচনার অংশ হিসেবে দেশটি হরমুজ প্রণালীর ওমান-সংলগ্ন অংশ দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধাহীন প্রবেশাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব বিবেচনা করছে। সূত্র অনুযায়ী, সম্ভাব্য একটি চূড়ান্ত সমঝোতা চুক্তি সম্পন্ন হলে এই সুবিধা কার্যকর হতে পারে। উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই প্রণালিতে নৌ-চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহে গুরুতর সংকট সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে শতাধিক বাণিজ্যিক জাহাজ ও হাজারো নাবিক উপসাগরীয় এলাকায় আটকে পড়েছে। যদিও সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, তবুও প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ইস্যু এখনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। তেহরানঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, ওমান নিয়ন্ত্রিত জলসীমা ব্যবহার করে জাহাজ চলাচলে শিথিলতা দেওয়া হতে পারে; তবে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা, মাইন অপসারণ কিংবা নির্দিষ্ট দেশের জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতিক্রিয়া এবং পারস্পরিক শর্ত পূরণের ওপরই এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন নির্ভর করছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও সামরিক ভারসাম্য প্রশ্নে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করে এমন এক অভিযোগ সামনে এসেছে, যেখানে বলা হচ্ছে—ইরান একটি চীনা গোয়েন্দা স্যাটেলাইটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র-এর সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর নজরদারি সক্ষমতা অর্জন করেছে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে ফাঁস হওয়া সামরিক নথির বরাতে এই দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘টিইই-০১বি’ নামের স্যাটেলাইটটি একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উৎক্ষেপণের পর ২০২৪ সালের শেষদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) অ্যারোস্পেস ইউনিটের নিয়ন্ত্রণে আসে। অভিযোগ রয়েছে, এই স্যাটেলাইট ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটির ওপর নজরদারি চালানো হয় এবং সামরিক অভিযানের আগে-পরে সংশ্লিষ্ট স্থাপনার চিত্র সংগ্রহ করা হয়। এতে আরও উল্লেখ করা হয়, সংশ্লিষ্ট চুক্তির আওতায় ইরান বেইজিংভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের গ্রাউন্ড স্টেশন ব্যবহারের সুবিধা পায়, যার মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তথ্য সংগ্রহের সুযোগ সৃষ্টি হয়। তবে রয়টার্স এ তথ্যের স্বাধীন যাচাই নিশ্চিত করতে পারেনি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো—হোয়াইট হাউস, পেন্টাগন কিংবা চীনা কর্তৃপক্ষ—এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। অন্যদিকে, চীন এই অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এ ধরনের প্রযুক্তিগত সহযোগিতার অভিযোগ আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষত রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে নতুন বিতর্ক উসকে দিতে পারে। আইন ও কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি প্রমাণিত হলে তা আন্তর্জাতিক বিধি-বিধান লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্যমান উত্তেজনার মধ্যে এই অভিযোগ নতুন করে ভূরাজনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নিয়মিত নজরদারি কার্যক্রম চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি উন্নতমানের সামরিক ড্রোন বিধ্বস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনী। ঘটনাটি ঘটে গত ৯ এপ্রিল হরমুজ প্রণালি এলাকায়। বিধ্বস্ত ড্রোনটি ছিল এমকিউ ৪সি ট্রাইটন, যা দীর্ঘ সময় উচ্চ আকাশে থেকে গোয়েন্দা নজরদারি পরিচালনায় সক্ষম এবং “ডানাযুক্ত উপগ্রহ” হিসেবে পরিচিত। প্রায় ২৪ কোটি ডলার মূল্যের এই ড্রোনটি নর্থরপ গ্রুম্যান-এর তৈরি এবং এটি ইতালির সিসিলিতে অবস্থিত সিগোনেল্লা নৌঘাঁটি থেকে পরিচালিত হচ্ছিল। নৌবাহিনীর তথ্যমতে, নিয়মিত মিশন শেষে ফেরার পথে ড্রোনটি হঠাৎ বিপদ সংকেত পাঠায় এবং পরবর্তীতে এর সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এটি প্রায় ৫০ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে দ্রুত নিচে নেমে আসে এবং এরপর আর কোনো সন্ধান মেলেনি। ড্রোনটি শত্রুপক্ষের আক্রমণে ধ্বংস হয়েছে কি না তা এখনো নিশ্চিত করা হয়নি। ঘটনাটি এমন এক সময় ঘটেছে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে।