রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে শিশুদের মধ্যে হাঁপানি ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, এই অবস্থার পেছনে বায়ুদূষণই মূল কারণ।
জাতীয় শিশু হাসপাতালের শ্বাসযন্ত্র বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ১৫০ জন শিশু শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ শিশুই হাঁপানির লক্ষণ নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে।
দূষণই মূল দায়ী:
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মেহরাজুল ইসলাম বলেন, “শিশুরা বায়ু দূষণের সবচেয়ে বেশি শিকার। ধুলাবালি, গাড়ির কালো ধোঁয়া ও শিল্পবর্জ্যের কারণে বাতাসে ভাসমান ক্ষুদ্র কণাগুলো তাদের ফুসফুসে গিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা তৈরি করছে।”
তিনি আরও জানান, শুধু শহর নয়, এখন গ্রামীণ এলাকাতেও হাঁপানির হার বেড়েছে, কারণ ধানের খড় পোড়ানো, ইটভাটা ও স্থানীয় সড়কের ধুলোবালি শিশুরা সহজে সহ্য করতে পারে না।
অভিভাবকদের উদ্বেগ:
রাজধানীর মুগদা এলাকার বাসিন্দা শারমিন আক্তার বলেন, “আমার ৬ বছরের ছেলের প্রতিদিন সন্ধ্যার পর কাশি ও নিঃশ্বাসের কষ্ট শুরু হয়। ডাক্তার বলেছেন, এটা হাঁপানি। মাস্ক পরানো ও ঘরের বাইরে কম যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উদ্যোগ:
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিশুদের হাঁপানির প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। শহরাঞ্চলে স্কুলগামী শিশুদের জন্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ:
চিকিৎসকরা শিশুদের ধুলাবালি ও ধোঁয়ার সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখতে অভিভাবকদের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বাসায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, নিয়মিত ইনহেলার ব্যবহার এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
উপসংহার:
শিশুদের শ্বাসযন্ত্রের সুস্থতা নিশ্চিত করতে পরিবেশগত সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি সচেতনতা ও দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি। নইলে ভবিষ্যতে এই সমস্যা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দেশে তরুণ ও অবিবাহিতদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৮৯১ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে, যাদের মধ্যে ২১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। জাতীয় এইডস ও এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ, ইনজেক্টেবল ড্রাগ ব্যবহার, কনডমসহ সুরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার না করা এবং যৌন স্বাস্থ্য সম্পর্কে অজ্ঞতা তরুণদের মধ্যে সংক্রমণের প্রধান কারণ। বিশেষজ্ঞরা সামাজিক লজ্জা ভাঙা, প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা জোরদার এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করার মাধ্যমে এই হারের নিয়ন্ত্রণে আহ্বান জানিয়েছেন। ঢাকার হাসপাতালের চিকিৎসাধীন এক তরুণ জানান, “অন্যের ব্যবহৃত সুচের ঝুঁকি আমি জানতাম না; জানলে কখনোই তা করতাম না।” অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, নিয়মিত ওষুধ নিলে এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন, তবে সামাজিক ভীতি ও লজ্জার কারণে অনেকেই চিকিৎসা শুরু করতে দেরি করছেন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, প্রযুক্তি, নগরায়ণ ও সামাজিক পরিবর্তনের কারণে তরুণদের যৌন আগ্রহ বেড়েছে, কিন্তু যৌন স্বাস্থ্য সচেতনতা কম থাকায় সংক্রমণ আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে।
দেশে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ত্বক ফর্সাকারী ক্রিমে মেটাল বা ভারী ধাতব উপাদান ব্যবহারের কারণে ত্বক ও কিডনিসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা সর্তকতা জারি করেছেন এবং দ্রুত নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (DGDA) এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, বাজারে পাওয়া বেশ কিছু নামিদামি ফেয়ারনেস ক্রিমে পারদ (Mercury), সিসা (Lead), আরসেনিক (Arsenic) এবং ক্যাডমিয়াম (Cadmium)-এর মতো ক্ষতিকর উপাদান অনুমোদিত সীমার বহু গুণ বেশি পরিমাণে রয়েছে। চিকিৎসকদের উদ্বেগ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. ফারহানা পারভীন বলেন, “এসব ক্রিমের ব্যবহারে ত্বক ফর্সা হওয়া তো দূরের কথা, বরং তা ত্বকের স্থায়ী ক্ষত, চুলকানি, ফুসকুড়ি ও পিগমেন্টেশনের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এগুলো কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপরও প্রভাব ফেলে।” তিনি আরও জানান, অনেক নারী দীর্ঘদিন এসব ক্রিম ব্যবহারের পর ত্বকের স্বাভাবিক রঙ হারিয়ে ফেলছেন, আবার কেউ কেউ গুরুতর সংক্রমণের শিকার হচ্ছেন। বাজারে অনিয়ন্ত্রিত পণ্য বাজারে অনেক পণ্য বিদেশি ব্র্যান্ডের নামে বাজারজাত করা হলেও তাদের যথাযথ নিবন্ধন নেই। কিছু ক্রিমের গায়ে উপাদানের উল্লেখ থাকলেও তা ভুয়া বা ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়। ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্টসকর্মী সালমা খাতুন বলেন, “টিভি বিজ্ঞাপনে দেখে একটা ক্রিম কিনেছিলাম। কয়েকদিন ব্যবহারের পর মুখে জ্বালা-পোড়া শুরু হয়। পরে ডাক্তার দেখিয়ে জানতে পারি তাতে ক্ষতিকর রাসায়নিক ছিল।” বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ত্বক ফর্সাকারী পণ্যে আকৃষ্ট না হয়ে প্রাকৃতিক পরিচর্যায় গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ত্বক ভিন্ন ভিন্ন কারণে কালচে হতে পারে—তাই সঠিক রোগ নির্ণয় ছাড়া যেকোনো ক্রিম ব্যবহার বিপজ্জনক। সরকারি অবস্থান ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং অচিরেই বাজার থেকে ক্ষতিকর ক্রিমগুলো জব্দ করা হবে। পাশাপাশি, ভোক্তাদের সচেতন করার জন্য গণমাধ্যমে প্রচার চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
হাজার বছর ধরে উপমহাদেশের আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ও ঘরোয়া পথ্য ব্যবস্থায় তুলসি পাতা এক অবিচ্ছেদ্য নাম। তুলসি শুধু একটি গাছ নয়—এটি স্বাস্থ্য, উপকারিতা ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য প্রতীক। বৈজ্ঞানিক গবেষণাও প্রমাণ করেছে যে তুলসিতে রয়েছে এমন কিছু উপাদান, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো থেকে শুরু করে হৃদরোগ প্রতিরোধ পর্যন্ত বিস্তৃত। নিচে তুলে ধরা হলো তুলসি পাতার পাঁচটি উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্যগুণ, যা প্রতিটি ঘরে জানার মতো। ১. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় তুলসি পাতায় থাকা প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল উপাদান শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (ইমিউনিটি) বাড়াতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে সিজনাল ফ্লু, ঠান্ডা-কাশি বা ভাইরাস সংক্রমণের সময় নিয়মিত তুলসি পাতা সেবন করলে শরীর অনেক বেশি প্রতিরোধক্ষম হয়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক গবেষণায় দেখা গেছে, তুলসি চায়ের নিয়মিত গ্রহণ ৪৫% পর্যন্ত সাধারণ ঠান্ডাজনিত রোগের ঝুঁকি কমাতে পারে। ২. মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমায় তুলসি পাতার সুগন্ধ ও উপাদান মস্তিষ্কে ‘কর্টিসল’ হরমোনের নিঃসরণ কমায়, যা মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক। অনেকে তুলসিকে ‘ন্যাচারাল অ্যাডাপ্টোজেন’ বলে থাকেন, কারণ এটি শরীরকে মানসিক চাপের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে। চিকিৎসকরা বলছেন, প্রতিদিন সকালে খালি পেটে তুলসি পাতা চিবালে বা তুলসি চা পান করলে সারাদিন মন শান্ত ও সতেজ থাকে। ৩. রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য তুলসি একটি উপকারী প্রাকৃতিক সহায়ক। তুলসি পাতা ইনসুলিন নিঃসরণে সাহায্য করে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। তবে এটি কোনো ওষুধের বিকল্প নয়—পরামর্শ অনুযায়ী খাবারের সঙ্গে তুলসি পাতা গ্রহণ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। ভারতের ‘জার্নাল অব ক্লিনিকাল হেরবাল মেডিসিন’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, ৬ সপ্তাহ তুলসি পাতা সেবনের ফলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। ৪. শ্বাসতন্ত্রের রোগে কার্যকর তুলসি পাতায় থাকা ইউজেনল ও সাইনোল নামক উপাদান কাশি, হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিসসহ নানা শ্বাসতন্ত্রের রোগে উপকারী হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে ঠান্ডা লাগা, গলায় খুশখুশ ভাব বা শ্বাসকষ্টের সময় তুলসি পাতার রস মধুর সঙ্গে খেলে উপশম মেলে। গ্রামাঞ্চলে তুলসি পাতা, আদা ও গোল মরিচ দিয়ে তৈরি পানীয় ‘কাড়া’ এখনো ব্যাপক জনপ্রিয়। ৫. ত্বক ও চুলের যত্নে সহায়ক তুলসি পাতার অ্যান্টি-ফাঙ্গাল ও অ্যান্টি-সেপটিক উপাদান ত্বকের ব্রণ, ফুসকুড়ি ও চুলকানি প্রতিরোধে সাহায্য করে। এছাড়া তুলসি চুলের গোড়া মজবুত করে ও খুশকি দূর করে। অনেক হোমমেড ফেসপ্যাক ও হেয়ার মাস্কে তুলসি পাতা গুঁড়ো বা রস ব্যবহার করা হয়। নিয়মিত ব্যবহারে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়।