বর্তমান ব্যস্ত জীবনযাত্রা ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের প্রভাবে আমরা দিন দিন অলস হয়ে পড়ছি। শরীরচর্চার অভাবে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগসহ নানা অসুস্থতায় ভুগছেন বহু মানুষ। অথচ প্রতিদিন মাত্র ৩০ মিনিট নিয়মিত হাঁটলেই অনেক বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাঁটা শরীরের জন্য একটি সহজ, স্বাভাবিক এবং ঝুঁকিহীন ব্যায়াম। এটি কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেমকে সক্রিয় করে, ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়ায় এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ তারেক বলেন, “সাধারণ হাঁটা প্রতিদিনের রুটিনে অন্তর্ভুক্ত করলে রক্ত সঞ্চালন ভালো হয়, হৃৎপিণ্ড সুস্থ থাকে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিও ঘটে।”
নিয়মিত ৩০ মিনিট হাঁটার ফলে শরীর ও মনের উপর যেসব প্রভাব পড়ে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু নিচে তুলে ধরা হলো:
হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস পায়
রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে
ওজন কমাতে ও স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে
অস্থি ও পেশির শক্তি বাড়ায়
মানসিক চাপ কমায় ও মন ভালো রাখে
ঘুমের মান উন্নত হয়
গবেষণায় দেখা গেছে, সকালে খালি পেটে হালকা হাঁটা বা বিকেলের দিকে সূর্যাস্তের আগের সময়টি হাঁটার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। তবে সময়ের অভাবে কেউ যদি রাতে খানাপিনার কিছুক্ষণ পর হাঁটেন, তবুও সেটি উপকারি।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, হাঁটার সময় যেন জুতার আরাম, রাস্তার নিরাপত্তা এবং শরীরের পানির চাহিদা খেয়াল রাখা হয়।
হাঁটার সময় কিছু বিষয় অনুসরণ করলে উপকারিতা আরও বাড়ে:
সোজা হয়ে হাঁটুন
গতি ধীরে বাড়ান এবং ধীরে কমান
প্রতিদিন একই সময়ে হাঁটার চেষ্টা করুন
আরামদায়ক ও হালকা জুতা পরুন
মোবাইল বা হেডফোনে অতিরিক্ত মনোযোগ না দিয়ে চারপাশের দিকে খেয়াল রাখুন
হঠাৎ করেই দীর্ঘ সময় হাঁটা শুরু না করে ধাপে ধাপে অভ্যাস তৈরি করা উচিত। প্রথমে প্রতিদিন ১০-১৫ মিনিট হাঁটার মাধ্যমে শুরু করুন, এরপর ধীরে ধীরে সময় বাড়ান। চাইলে পরিবারের কাউকে সঙ্গী করতে পারেন। এমনকি অফিসে লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করাও একটি কার্যকর উপায়।
বর্তমানে স্মার্টফোন ও স্মার্টওয়াচের অ্যাপগুলো ব্যবহার করে প্রতিদিন কত পা হাঁটলেন বা কত ক্যালোরি খরচ হল তা সহজেই নজরদারি করা যায়। এ প্রযুক্তি মানুষকে হাঁটার প্রতি আগ্রহী করতে সাহায্য করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হাঁটা একটি "মেডিসিন-বিহীন থেরাপি"। এমন অভ্যাস গড়ে তুললে ঔষধের উপর নির্ভরতা কমে, স্বাস্থ্যব্যয় কমে এবং জীবনযাত্রা আরও সহজ হয়।
তথ্যসূত্র:
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)
বাংলাদেশ ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটি ফোরাম
ঢাকা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসকদের মতামত
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবাখাতে যুগান্তকারী সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি, নতুন উপদ্রুত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ‘পাখি–ফ্লু’র প্রথম প্রাদুর্ভাব। একদিকে প্রতিরোধমূলক আইন নিয়ে চলেছে বড় আলোচনা, অন্যদিকে জীবাণুমুক্ত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই এখন জোরদার চ্যালেঞ্জ। স্বাস্থ্য খাত সংস্কারের বড় ধাপ স্বাস্থ্য ক্ষেত্র সংস্কার কমিশন একটি ঐতিহাসিক রিপোর্ট উপস্থাপন করেছে, যেখানে প্রস্তাব রাখা হয়েছে: প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ‘সবার জন্য বিনামূল্যে’ নিশ্চিত করতে সাংবিধানিক অধিকার ঘোষণার দাবি । স্বতন্ত্র ও স্থায়ী ‘বাংলাদেশ স্বাস্থ্য কমিশন’ গঠনের পরামর্শ, যা জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির পরামর্শদাতা ও মান–নিয়ন্ত্রক সংস্থা হবে । তবে, বাজেট বরাদ্দ ও বাস্তবায়নের স্পষ্ট পথিকা এখনও তৈরি হয়নি—স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ও আন্তঃমন্ত্রণালয় যৌথ কমিটি জরুরি । এ ছাড়াও, কমিশন ১৫% জাতীয় বাজেট স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ, আর রোগ–নিয়ন্ত্রণ ও ঔষধ ও মানবশক্তি বিষয়ে বিশেষ পদক্ষেপের সুপারিশ করেছে । পাখি–ফ্লু: দেশে ৭ বছর পর প্রথম আঘাত জেসোর জেলার একটি পোল্ট্রি খামারে ‘হাইলি প্যাথোজেনিক অ্যাভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা’ (HPAI) শনাক্ত হয়েছে — ৩,৯৭৮টি মুরগির মধ্যে ১,৯০০টি মারা যায়, বাকি বাদী করা হয়েছে । এটি পড়ে আদালতকারি ভ্যাকসিনেশন, খামার পর্যবেক্ষণ ও জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি হয়েছে। পরিবেশগত এবং আর্থ–সামাজিক হুমকি দূষণজনিত রোগ: ঢাকা শহরের বায়ুমণ্ডল সাম্প্রতিক হারে “হাজার্ডাস” পর্যায়ে পৌঁছয়, যা সাধারণ মানুষ ও হাঁপানির রোগীদের জন্য বিপজ্জনক—অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় আইন–সচেতনার জন্য আবেদন জানিয়েছেন । চিকিৎসা ব্যবস্থার ঝুঁকি: উঁচু রক্তচাপ ও NCD–এর কারণে মৃত্যুর হার বেড়ে ৭১%, কিন্তু তিনি শুধু ৪.২% বাজেট বরাদ্দ পাওয়া নিয়ে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ । কী বলা হলো এক নজরে? বিষয় অবস্থা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বিনামূল্যে ঘোষণা, আইনকে সাংবিধানিক অধিকার বাংলাদেশ স্বাস্থ্য কমিশন গঠন প্রস্তাব বাজেট বরাদ্দ ১৫% দাবি প্রতিষ্ঠিত রোডম্যাপ এখনও অপেক্ষায় পাখি–ফ্লু প্রথম প্রাদুর্ভাব, ১,৯০০ মুরগি মারা গিয়েছে পরিবেশমূলক স্বাস্থ্যচ্যালেঞ্জ দূষণ ভয়াবহ, NCD–সংক্রান্ত মৃত্যুহার ও উদ্বেগ বিশ্লেষণ স্বাস্থ্য খাতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের উদ্যোগ সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্য সবার নাগাল নিশ্চিত না হলে বড় পরিকল্পনার সফলতা অনিশ্চিত। ‘স্বাস্থ্য–কমিশন’ গঠন ও বাজেটে বড় পরিবর্তন আনা গেলে জাতীয় স্বাস্থ্য মানে দীর্ঘমেয়াদি লাভ হবে। তবে অপরদিকে, নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব ও দূষণের মতো অপ্রত্যাশিত হুমকি মোকাবিলার জন্য দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একাধিক স্তরে প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ না দিলে জনগণের নিরাপদ–সেবা পাওয়া ঝুঁকির সম্মুখীন। বাংলাদেশ স্বাস্থ্যখাতে বড় পরিবর্তনের মুখে, তবে বাস্তবায়ন ও সময়ানুবর্তী পন্থা নিশ্চিত না হলে সব প্রচেষ্টা বৃথা। সরকারের উচিত দ্রুত রোডম্যাপ প্রকাশ করে জনগণের বিশ্বাস অর্জন করা।
বিশ্ব এখন আবার এক অজানা ভাইরাসের আতঙ্কে। কোভিড-১৯ এর দুঃসহ অভিজ্ঞতা এখনও সবার মনে তাজা। সেই রকমই আরেকটি ভাইরাসের সংক্রমণের খবর পাওয়া যাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে। যদিও এর নাম, প্রকৃতি ও বিস্তার এখনও সম্পূর্ণভাবে জানা যায়নি, তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন এটি সংক্রমণযোগ্য এবং মানুষের জীবনধারায় নতুন করে প্রভাব ফেলতে পারে। এই নতুন ভাইরাস মূলত সর্দি, জ্বর, গলা ব্যথা ও ক্লান্তি দিয়ে শুরু হয়। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট, বমি, কিংবা দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসকরা এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলতে না পারলেও এ নিয়ে চলছে গবেষণা। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিমধ্যেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে—আবার কি লকডাউন আসছে? আবার কি স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে যাবে? মাস্ক, স্যানিটাইজার, দূরত্ব—সব আবার শুরু? এমন আতঙ্কের সময় সবচেয়ে প্রয়োজন সচেতনতা ও প্রস্তুতি। আতঙ্কিত না হয়ে আমাদের উচিত তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং পরিবারকে সুরক্ষিত রাখার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস গড়ে তোলা। প্রথমেই আসি ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে। ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, বিশেষ করে বাইরে থেকে এসে, খাবার খাওয়ার আগে ও পরে। অ্যালকোহল-ভিত্তিক হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারও উপকারী। চোখ, মুখ ও নাক বারবার স্পর্শ না করাই ভালো, কারণ এখান থেকেই ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করতে পারে। মাস্ক পরার অভ্যাস আবার গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে জনসমাগমপূর্ণ জায়গায় গেলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করা উচিত। এতে শুধু নিজেকে নয়, অন্যদেরও রক্ষা করা যায়। মনে রাখা দরকার, ভাইরাস বাহক ব্যক্তি নিজে অসুস্থ না হলেও অন্যকে সংক্রমিত করতে পারে। পর্যাপ্ত পানি পান করা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম—এই সবগুলোই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। ঘরে যদি ছোট বাচ্চা বা বৃদ্ধ কেউ থাকে, তাদের আরও বেশি যত্ন নেওয়া প্রয়োজন, কারণ এদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে দুর্বল। যাদের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিচ্ছে, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ না নেওয়াই ভালো। অনেক সময় গুজব বা সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ভুল তথ্য মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কিংবা স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুসরণ করাই সর্বোত্তম। এছাড়া অফিস বা স্কুল-কলেজ কর্তৃপক্ষেরও উচিত প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে কঠোরতা আরোপ করা। যদি ভাইরাসটির প্রকোপ বাড়ে, তবে সরকার কর্তৃক নির্দেশিত নির্দেশিকা মানা জরুরি হবে। সবাই মিলে যদি সচেতনভাবে এগিয়ে আসে, তবে ভয় নয়, বরং দায়িত্ব নিয়েই এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। সবশেষে বলা যায়—নতুন ভাইরাসের আতঙ্ক সত্য, কিন্তু আতঙ্কিত হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া আরও ভয়াবহ হতে পারে। স্বাস্থ্যবিধি মানা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক দায়িত্ব পালন—এই তিনটি পথই আমাদের রক্ষা করতে পারে। আপনার সচেতনতা মানেই আপনার পরিবারের নিরাপত্তা। আমরা যদি সবাই সচেতন থাকি, তবে একসঙ্গে এই সংকটও অতিক্রম করা সম্ভব।