বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে নতুন জাতীয় কারিকুলামের মাধ্যমে। গত কয়েক দশক ধরে পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা, মুখস্থনির্ভরতা এবং বাস্তব জীবনের সঙ্গে সংযোগহীন শিক্ষার অভিযোগ ছিল পুরনো। এসব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ২০২৩ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে প্রবর্তন করেছে নতুন পাঠ্যক্রম। লক্ষ্য—একটি সৃজনশীল, কার্যকর ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
কিন্তু বাস্তবতা বলছে—এই পরিবর্তনের পথে যেমন রয়েছে আশা, তেমনি রয়েছে দ্বিধা ও দুশ্চিন্তা।
নতুন কারিকুলাম মূলত পরীক্ষার চাপে নয়, শেখার আনন্দে বিশ্বাস করে। এটি শিক্ষার্থীদের চিন্তা, বিশ্লেষণ ও বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে প্রস্তুত করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
মূল্যায়নের কাঠামোতেও এসেছে পরিবর্তন। বার্ষিক বা সেমিস্টারভিত্তিক বড় পরীক্ষা নয়, বরং ধারাবাহিক মূল্যায়ন, কার্যক্রমভিত্তিক কাজ, সহপাঠ কার্যক্রম ও সামাজিক দক্ষতা অর্জনের উপর ভিত্তি করে ফল নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
এনসিটিবি বলছে, নতুন কারিকুলামে ৬টি মূল লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে—নৈতিকতা, দেশপ্রেম, তথ্য ও প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষমতা, সৃজনশীলতা, সহযোগিতা এবং দায়িত্ববোধ।
তবে শিক্ষকদের বড় একটি অংশ মনে করেন, কারিকুলামের দর্শন যতই আধুনিক হোক না কেন, এর বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ছিল সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ-ভিত্তিক সহায়তা এবং নীতিগত স্পষ্টতা—যা অনেক জায়গায় অনুপস্থিত।
রাজধানীর একটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. কামরুজ্জামান বলেন,
“এই কারিকুলাম বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিল রেখে শিক্ষাদানের কথা বলে, কিন্তু আমাদের অনেক সহকর্মী এখনো জানেন না কীভাবে অ্যাসাইনমেন্ট মূল্যায়ন করতে হবে, বা ক্লাসে গ্রুপ-ওয়ার্ক চালাতে হবে কোন পদ্ধতিতে।”
তিনি আরও বলেন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম ছিল সীমিত সময়ের, তাড়াহুড়ো করে শেষ করা হয়েছে। ক্লাসে বাস্তবে কীভাবে পরিবর্তন আনা যাবে—সে বিষয়ে তারা এখনও অনিশ্চিত।
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসফিয়া রহমান জানায়,
“আগে পরীক্ষা হলে বুঝতাম কোন বিষয় থেকে কতটা পড়তে হবে। এখন অ্যাসাইনমেন্ট আর প্রজেক্ট এমনভাবে আসে যে বুঝতে পারি না কোনটা গুরুত্বপূর্ণ, কোনটা নয়।”
অন্যদিকে অনেক শিক্ষার্থী স্বীকার করেছে, এই পদ্ধতি নতুন হলেও আগ্রহ সৃষ্টি করছে। তারা বলছে, গ্রুপ-ওয়ার্ক ও উপস্থাপনার মাধ্যমে নিজেদের চিন্তাভাবনা প্রকাশ করতে পারছে, যা আগে কখনো হয়নি।
তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য এটি বেশ বড় একটি চ্যালেঞ্জ। কারণ তাদের স্কুলে এখনও নেই প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, নেই প্রশিক্ষিত শিক্ষক বা পর্যাপ্ত বইপত্র।
নতুন এই পদ্ধতির সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন অভিভাবকরাও। আগে শিক্ষকেরা বা কোচিং সেন্টারগুলো সিলেবাসের একটা কাঠামো দিত, এখন তা অনুপস্থিত।
সন্তান পড়াচ্ছেন এমন একজন অভিভাবক বলেন,
“আমি নিজেও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি, কিন্তু মেয়ের বর্তমান পড়াশোনা পদ্ধতি বুঝতেই পারি না। না পারি সাহায্য করতে, না বুঝি সে ভালো করছে কিনা।”
তাদের অভিযোগ, স্কুলের পক্ষ থেকেও পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে না।
শিক্ষাবিদ ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন মনে করেন,
“এটি একটি যুগোপযোগী কারিকুলাম—নিঃসন্দেহে। কিন্তু এটি ‘বটম-আপ’ পদ্ধতিতে তৈরি হয়নি। শিক্ষকদের ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যাচাই না করেই অনেকটা উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ কারণে বাস্তবায়নে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, কারিকুলাম বাস্তবমুখী হতে হলে মাঠ পর্যায়ে যথাযথ সমন্বয়, রিসোর্স এবং শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে মূল্যায়নের একটি নির্ভরযোগ্য কাঠামো থাকতে হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (মাধ্যমিক) মিজানুর রহমান জানান,
“আমরা বুঝি, নতুন যেকোনো পরিবর্তনে সময় লাগে। প্রথম বছরগুলোতে কিছু জটিলতা আসবে। তবে এটি পর্যায়ক্রমে পরিমার্জন ও পর্যালোচনার মাধ্যমে আরও উন্নত করা হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণ চলমান রয়েছে, এবং আগামী বছরগুলিতে আরও সম্প্রসারিত হবে।”
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ অটোপাশ দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের হামলার শিকার হয়েছেন। গাজীপুর ক্যাম্পাস থেকে ঢাকায় ফেরার পথে সোমবার (৬ এপ্রিল) দুপুরে তাঁর গাড়িতে শিক্ষার্থীরা হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। এতে ভিসি চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। ঘটনাটি মূলত ২০২৩ সালের ডিগ্রি তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত। শিক্ষার্থীরা কিছু বিষয়ে ফেল করলেও অটোপাশের দাবিতে আন্দোলন করছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ দাবি অযৌক্তিক বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের ২১ মে একই ধরনের দাবিতে আন্দোলন চলাকালে ভিসি আহত হয়েছিলেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ-সংযোগ বিভাগ স্পষ্ট করেছে, ‘অন্যায্য দাবি ও অযৌক্তিক আবদারের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় সহানুভূতি দেখাবে না। অটোপাশ চালু হলে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ ঘটনার পর ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক মন্তব্যকে ঘিরে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু)-এর সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-কেন্দ্রিক রাজনীতি নিয়ে সমালোচনামূলক বক্তব্য দেওয়ায় বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। শুক্রবার (৬ মার্চ) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে তিনি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ ও জুলাই-পরবর্তী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ‘কোরাম’ বা গোষ্ঠীভিত্তিক রাজনীতির সমালোচনা করেন তিনি। পোস্টে নেপাল-এর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ টেনে সালাহউদ্দিন আম্মার মন্তব্য করেন, সেখানে গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিরা সরকার গঠন করতে পেরেছেন—কারণ সেখানে ঢাবিকেন্দ্রিক ‘ভাই-ব্রাদার কোরাম’ ধরনের রাজনীতির প্রভাব নেই বলে তিনি ইঙ্গিত করেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, তার বক্তব্যের সঙ্গে অনেকেই একমত হতে পারেন। রাকসুর এই নেতা তার স্ট্যাটাসে আরও বলেন, জুলাই-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে নেতৃত্বের দাবি, সংগঠনিক ভূমিকা বা ব্যক্তিগত অবদান নিয়ে অতিরিক্ত বিতর্ক তৈরি হয়েছে, যা তার ভাষায় ‘অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা’ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এছাড়া তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে আন্দোলন চলাকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়-এর উদ্যোগ বা কর্মসূচি যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। পোষ্য কোটা আন্দোলনের সময়ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে এ বিষয়ে প্রত্যাশিত উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন। নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আম্মার দাবি করেন, জুলাই-সম্পর্কিত নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন ঢাবিকেন্দ্রিকভাবে বড় পরিসরে হলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কর্মসূচি আয়োজনের প্রস্তাব নিয়ে সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়ে তিনি অবহেলার মুখে পড়েছেন। স্ট্যাটাসের শেষাংশে তিনি নেতৃত্ব নির্বাচনে জনপ্রিয়তা বা অনুসারীর সংখ্যার ভিত্তিতে মূল্যায়নের প্রবণতার সমালোচনা করেন এবং নেপাল-এর নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে শুভকামনা জানান।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নীতিমালা’ প্রকাশ করেছে, যা দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আর্থিক অনিয়ম রোধ, স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং জবাবদিহিতা জোরদার করার লক্ষ্য নিয়ে গৃহীত। নীতিমালা সোমবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের মাধ্যমে জারি করা হয়। নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভর্তি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে পুনঃভর্তি ফি আদায় করতে পারবে না। বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘টিউশন ফি নীতিমালা ২০২৪’ অনুযায়ী নির্ধারিত ফি নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, কোনো নতুন খাত তৈরি করে অর্থ আদায় করা যাবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় সরকারি আর্থিক বিধি-বিধান অনুসারে পরিচালনা করতে হবে। হিসাব সংরক্ষণ ও তদারকির দায়িত্ব প্রতিষ্ঠান প্রধান ও পরিচালনা কমিটির উপর যৌথভাবে চাপানো হয়েছে। আর্থিক অনিয়ম বা দুর্নীতির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টরা আইন অনুযায়ী দায়বদ্ধ থাকবেন। নীতিমালায় ব্যাংকিং ও অর্থপ্রাপ্তির প্রক্রিয়াও নির্ধারণ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের প্রদত্ত সব ফি, দান-অনুদান ও সম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত আয় সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক বা সোনালী পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হবে। জরুরি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে নগদ অর্থ গ্রহণ সম্ভব, যা দুই কর্মদিবসের মধ্যে ব্যাংকে জমা দিতে হবে। এছাড়া, আয়-ব্যয়ের খাতে কোনো সংযোজন, বিয়োজন বা পরিবর্তন করার আগে মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।