বর্তমানে বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে সর্বোচ্চ উচ্চতায়, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। স্বর্ণের প্রতি এই অস্বাভাবিক চাহিদা ও মূল্যবৃদ্ধির পেছনে রয়েছে একাধিক অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক কারণ।
বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং মুদ্রাস্ফীতি যখন বাড়ছে, তখন বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছে। ইতিহাস বলছে, মন্দার সময়ে কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতায় স্বর্ণকে মানুষ সবসময় নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে দেখে এসেছে। বর্তমানে ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং স্থানীয় মুদ্রার মান কমে যাওয়ায় বাংলাদেশেও আমদানিকৃত স্বর্ণের মূল্য বেড়ে গেছে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে চীন ও ভারতের মতো বড় দেশের পক্ষ থেকে ব্যাপক পরিমাণে স্বর্ণ কেনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিয়ের মৌসুম, ধর্মীয় উৎসব এবং ঋতুভিত্তিক চাহিদা এই কেনাকাটাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। এই বৈশ্বিক চাহিদা সরবরাহে টান তৈরি করছে, যার প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের বাজারেও।
স্থানীয়ভাবে ব্যাংকে সুদের হার কমে যাওয়ায় অনেকেই আর টাকা জমা না রেখে স্বর্ণে বিনিয়োগ করছেন। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া যারা বিদেশে থাকেন এবং দেশে টাকা পাঠান, তারাও রেমিট্যান্সের টাকা দিয়ে স্বর্ণ কিনে রাখছেন ভবিষ্যতের জন্য।
বাংলাদেশে স্বর্ণ আমদানির ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকায় সরবরাহের সমস্যা প্রায়শই দেখা যায়। এই সরবরাহ সংকটও মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। আবার স্থানীয় জুয়েলারি ব্যবসায়ীরাও বাজারে অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে কখনও কখনও দাম বাড়িয়ে দেন।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, স্বর্ণের দাম বাড়ার পেছনে রয়েছে একটি বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির জটিল সমীকরণ। যদিও কেউ কেউ আশা করছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দাম কমে আসবে, তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বর্ণের প্রতি মানুষের আগ্রহ এবং বিনিয়োগ প্রবণতা এখনই কমছে না। ফলে দাম কিছুটা উঠানামা করলেও স্বর্ণের বাজার আরও কিছুদিন চাঙা থাকবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
দেশীয় বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ ও কাঁচামালের দামের ঊর্ধ্বগতির প্রেক্ষাপটে মূল্যবান ধাতুর দামে পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী সমন্বয় কার্যকর করেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। সর্বশেষ নির্ধারিত দামে শনিবার (১৮ এপ্রিল) থেকে স্বর্ণ ও রুপা নতুন দামে বিক্রি হচ্ছে। সংগঠনটির বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণ ও রুপার দর বৃদ্ধির প্রভাব বিবেচনায় এনে এ সমন্বয় করা হয়েছে। এর ফলে প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের মূল্য নির্ধারিত হয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার ১৯৩ টাকা। পাশাপাশি ২১ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮২০ টাকা, ১৮ ক্যারেট ২ লাখ ৪ হাজার ৭০৩ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণ ১ লাখ ৬৬ হাজার ৭৩৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর আগে গত ১৫ এপ্রিল জারি করা সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভরিতে স্বর্ণের দাম ২ হাজার ২১৬ টাকা এবং রুপার দাম ৩৫০ টাকা বাড়ানো হয়, যা একই দিন সকাল ১০টা থেকে কার্যকর হয়। বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বৈশ্বিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশীয় সরবরাহ পরিস্থিতির প্রভাবে এ খাতে মূল্য সমন্বয়ের ধারা অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে আগামীতেও দামে পুনঃসমন্বয়ের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
চলতি এপ্রিল মাসের প্রথম ১২ দিনে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ১৪৩ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ১৭ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা। সোমবার (১৩ এপ্রিল) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য নিশ্চিত করেন।তিনি জানান, এই সময়ে দৈনিক গড় রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল প্রায় ১১ কোটি ৯৮ লাখ ডলার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, গত বছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স ছিল ১০৫ কোটি ২০ লাখ ডলার। ফলে বছর ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। চলতি অর্থবছরের ১২ এপ্রিল পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্স দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৬৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ২১ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। এর আগে মার্চ মাসে দেশে একক মাসে সর্বোচ্চ ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স আসে। ফেব্রুয়ারি ও জানুয়ারিতেও প্রবাহ ছিল যথাক্রমে ৩০২ কোটি ও ৩১৭ কোটি ডলারের বেশি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ধারাবাহিক এই ঊর্ধ্বমুখী রেমিট্যান্স প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) দেশের স্বর্ণ ও রূপার বাজারে নতুন মূল্য নির্ধারণ করেছে। বুধবার (৮ এপ্রিল) প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ৬ হাজার ৫৯০ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ২ লাখ ৫২ হাজার ৪০৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজারে তেজাবি স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে এই সমন্বয় করা হয়েছে। নতুন সমন্বয় অনুযায়ী, ২১ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম ভরিতে ২ লাখ ৪০ হাজার ৯২০ টাকা, ১৮ ক্যারেটের ২ লাখ ৬ হাজার ৫১১ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৬৮ হাজার ১৯৫ টাকা হয়েছে। এর পাশাপাশি রূপার দামও বৃদ্ধি পেয়েছে; ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম ৩৫০ টাকা বাড়িয়ে ৫ হাজার ৮৯০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। চলতি বছরে স্বর্ণের দাম দেশের বাজারে মোট ৫৩ বার সমন্বয় করা হয়েছে, যার মধ্যে ৩১ বার বৃদ্ধি এবং ২২ বার হ্রাস করা হয়েছে। রূপার ক্ষেত্রে ৩২ বার দাম সমন্বয় করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৮ বার বৃদ্ধি ও ১৪ বার হ্রাস।