দেশে কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটাতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে গত এক দশকে। ফলস্বরূপ, জাতীয় পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ নিয়ে পাশ করার পরও একটি বড় অংশের শিক্ষার্থী কাজ পাচ্ছে না নিয়মিতভাবে। বেকারত্ব, দক্ষতা ঘাটতি এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগের অভাবকে এর মূল কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
কারিগরি শিক্ষাকে জনপ্রিয় করতে সরকারের পক্ষ থেকে এসএসসি পাসের পর ৪ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্স, স্বল্পমেয়াদি ট্রেনিং, আর্থিক প্রণোদনা ও বিনা মূল্যে ভর্তি কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে যেখানে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির হার ছিল মাত্র ১.৬ শতাংশ, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ শতাংশে।
ময়মনসিংহ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের একজন শিক্ষক জানান,
“আগে অভিভাবকরা ছেলেমেয়েকে কারিগরি শিক্ষায় দিতে চাইতেন না। এখন অনেকেই বুঝছেন যে শুধু সাধারণ পড়াশোনায় চাকরি পাওয়া কঠিন।”
তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করা হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রতিবছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও অধিকাংশই যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেও তারা কম মজুরির সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন অথবা প্রাসঙ্গিক কোনো কর্মসংস্থান না পেয়ে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন।
দিনাজপুরের একটি সরকারি পলিটেকনিক থেকে পাশ করা শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম বলেন,
“আমরা যেসব টেকনিক্যাল বিষয় শিখি, বাস্তবে সেগুলোর চাহিদা কম। আবার ইন্ডাস্ট্রি কী চাইছে, সেটাও আমাদের জানানো হয় না। ফলে সনদ থাকলেও চাকরি হয় না।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া লিংকেজ না থাকা। অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো পুরনো সিলেবাসে পাঠদান চলছে। ফলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের প্রায় ৪৮ শতাংশ স্নাতকোত্তর পর্যায়ের অতিরিক্ত ডিগ্রি নিয়েও বেকার থাকছেন ১ থেকে ৩ বছর পর্যন্ত।
বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের চাহিদা মেলাতে না পারায় কারিগরি শিক্ষা কাঙ্ক্ষিত সুফল দিতে পারছে না।
সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রকল্প যেমন—Skills for Employment Investment Program (SEIP) ও National Skills Development Policy বাস্তবায়ন করা হলেও এগুলোর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ সংযোগ কম।
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান,
“আমরা দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাফল্য এসেছে, কিন্তু বড় পরিসরে বাস্তব ফল এখনো আসেনি।”
বেসরকারি পলিটেকনিকগুলোর অব্যবস্থাপনা ও মানহীন প্রশিক্ষণকেও একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার অভিযোগ করছে, প্রার্থীদের সার্টিফিকেট থাকলেও হাতে-কলমে দক্ষতা কম। দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মূল্যায়ন ও ইন্টার্নশিপ প্রক্রিয়া চালুর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেন,
“শুধু সনদ না, দক্ষতা নিশ্চিত করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা এখন প্রতিটি কোর্সে ইন্ডাস্ট্রি পার্টনারশিপ চালু করার উদ্যোগ নিচ্ছি।”
শিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন জানিয়েছেন, সরকার এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের উৎসব ভাতা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশে উন্নীত করার উদ্যোগ নিচ্ছে। বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। মন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের আগে এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যাচাই-বাছাই শেষে প্রধানমন্ত্রীকে প্রস্তাব দেওয়া হবে। কোন ধরনের অনিয়ম বা ঘুষ-বাণিজ্যের বিষয়ও খতিয়ে দেখা হবে। এছাড়া এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি প্রক্রিয়া দ্রুত কার্যকর করা হবে এবং বেতন বিলম্বের বিষয় পর্যবেক্ষণ করা হবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের প্রথম বর্ষ, স্নাতক (সম্মান) শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষায় মোবাইল ফোন ব্যবহার করে এআই অ্যাপের সহায়তায় উত্তর খোঁজার অভিযোগে এক ভর্তিচ্ছুক শিক্ষার্থীকে আটক করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বেলা ১১টায় ‘সি’ ইউনিটের প্রথম শিফটের পরীক্ষা চলাকালে এ ঘটনা ঘটে। আটক শিক্ষার্থীর নাম দিব্য জ্যোতি সাহা। তার রোল নম্বর ৩১১০০০৫২। তিনি ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীর বাসিন্দা হলেও স্থায়ী নিবাস খুলনায়। তার বাবা ড. সাহা চঞ্চল কুমার জনতা ব্যাংকের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার এবং মা অল্পনা সাহা গৃহিণী। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, পরীক্ষা চলাকালে হলের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক শিক্ষক ওই শিক্ষার্থীর অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করেন। পরে কাছে গিয়ে দেখা যায়, তিনি মোবাইল ফোনে ছবি তুলে ‘ডিপসিক’ নামের একটি এআই অ্যাপ ব্যবহার করে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছেন। পরীক্ষা শেষে তাকে আটক করে প্রক্টর অফিসে নেওয়া হয়। এ বিষয়ে সহকারী প্রক্টর গিয়াসউদ্দিন জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী ওই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষক সংকট একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এই সংকট আরও প্রকট। অনেক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক না থাকায় একজন শিক্ষককেই একাধিক শ্রেণির পাঠদান করতে হচ্ছে। এতে করে পাঠদানের মান যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহও কমে যাচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৬৫ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদ্যালয়েই শিক্ষক স্বল্পতা রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একটি বিদ্যালয়ে তিন থেকে চারজন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে দেখা যায়, কোনো কোনো স্কুলে মাত্র একজন বা দুজন শিক্ষক দিয়ে পুরো বিদ্যালয় চালানো হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে একজন শিক্ষককে একসঙ্গে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির পাঠদান করতে হয়, যা কোনোভাবেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে শিক্ষকরা চরম মানসিক চাপের মধ্যে পড়েন। একজন শিক্ষক যখন একই সময় একাধিক শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের পড়ান, তখন স্বাভাবিকভাবেই কোনো শ্রেণির উপর পর্যাপ্ত সময় ও মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জনে ব্যর্থ হয়। এইভাবে ধাপে ধাপে শিখনের ঘাটতি তৈরি হয়, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ভবিষ্যত শিক্ষাজীবনেও। শুধু পাঠদানের ক্ষেত্রেই নয়, একজন শিক্ষককে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজ, মিডডে মিল, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে সমন্বয়, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হিসাব রাখা, নানা রিপোর্ট প্রস্তুত করাসহ আরও অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়। এক্ষেত্রে শিক্ষক যতই আন্তরিক হোন না কেন, সীমিত জনবল ও অপ্রতুল সময়ের কারণে শিক্ষার মান উন্নয়ন অসম্ভব হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, শিক্ষার্থীরাও এই সংকটের কারণে দুর্বল ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করে। একজন শিক্ষক একসঙ্গে দুই-তিনটি শ্রেণির ক্লাস নেওয়ার সময় শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একঘেয়েমি সৃষ্টি হয় এবং তারা ধীরে ধীরে স্কুলে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এর ফলে ঝরে পড়ার হারও বাড়ছে। সরকার শিক্ষক নিয়োগে বিভিন্ন সময় উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সংকট কাটছে না। অনেক সময় নিয়োগপ্রাপ্তরাও দুর্গম এলাকায় যোগদান করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন, ফলে গ্রামাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতেই সংকট সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুত ও কার্যকর শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু করা দরকার। বিশেষ করে দুর্গম ও গ্রামীণ অঞ্চলের স্কুলগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, স্থায়ী পদ সৃষ্টি, নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রণোদনা প্রদান এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর বিকল্প শিক্ষা পদ্ধতিও বিবেচনায় আনা যেতে পারে, যাতে শিক্ষক সংকট থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় পাঠ গ্রহণ করতে পারে। প্রাথমিক স্তরেই যদি শিক্ষার্থীরা মানসম্পন্ন শিক্ষা না পায়, তবে তা পুরো শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই এখনই সময় কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার, যেন একজন শিক্ষককে আর একা একাধিক শ্রেণির ভার বইতে না হয় এবং দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে এগিয়ে যেতে পারে।