মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরান তার সামরিক সক্ষমতার নতুন প্রদর্শন ঘটিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান টানাপোড়েনের মধ্যে দেশটি সমুদ্রের নিচে নির্মিত গোপন মিসাইল সুড়ঙ্গের ভিডিও প্রকাশ করেছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) আরব নিউজের প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ওই ভিডিওতে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌ শাখার কমান্ডার আলীরেজা তাঙসিরিকে সুড়ঙ্গের ভেতরে অবস্থান করতে দেখা যায়। ভিডিওতে পানির নিচে সারিবদ্ধভাবে রাখা একাধিক ক্রুজ মিসাইল উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত অবস্থায় প্রদর্শিত হয়।
আইআরজিসির নৌ কমান্ডার জানান, ইরানের উপকূলীয় জলসীমা ও ওমান সাগরজুড়ে সমুদ্রতলের নিচে বিস্তৃত একটি মিসাইল অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। এসব সুড়ঙ্গে সংরক্ষিত শত শত মিসাইল প্রয়োজনে উপসাগরীয় অঞ্চল ও আশপাশে অবস্থানরত মার্কিন নৌবহরের বিরুদ্ধে ব্যবহারের সক্ষমতা রাখে। তার দাবি অনুযায়ী, এসব ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ‘কাদের-৩৮০ এল’ মডেলের মিসাইলগুলোতে উন্নত প্রযুক্তির ট্র্যাকিং সিস্টেম সংযোজন করা হয়েছে, যা আঘাতের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম।
এর আগে ইরান সতর্ক করে জানায়, দেশটির ওপর কোনো সামরিক আগ্রাসন চালানো হলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী নিরাপদ থাকবে না—যা আন্তর্জাতিক নৌ-পরিবহন ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। বুধবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি থেকে সম্পূর্ণ সরে আসতে হবে এবং তা নিশ্চিত করতে হলে নতুন করে চুক্তিতে আসার বিকল্প নেই। অন্যথায় বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
প্রসঙ্গত, গত বছরের জুনে ইরানের কয়েকটি পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র বিমান হামলা চালিয়েছিল। সেই সময় ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাত আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। সাম্প্রতিক এই পাল্টাপাল্টি হুমকি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।
আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে একটি মাদক পুনর্বাসনকেন্দ্রে বিমান হামলার ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানির অভিযোগ উঠেছে। তালেবান সরকারের দাবি অনুযায়ী, হামলায় অন্তত ৪০০ জন নিহত এবং প্রায় ২৫০ জন আহত হয়েছেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, কাবুলের দুই হাজার শয্যাবিশিষ্ট ওমর অ্যাডিকশন ট্রিটমেন্ট হাসপাতালে সোমবার (১৬ মার্চ) রাতের দিকে এই হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ করেছে আফগান প্রশাসন। তালেবান সরকারের ডেপুটি মুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, হামলার ফলে হাসপাতালের বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং হতাহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। অন্যদিকে পাকিস্তান এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে। ইসলামাবাদ দাবি করেছে, তাদের সামরিক বাহিনী কেবল কাবুল ও নানগাহার প্রদেশে অবস্থিত নির্দিষ্ট সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে সীমিত অভিযান পরিচালনা করেছে এবং বেসামরিক স্থাপনায় হামলার অভিযোগ ভিত্তিহীন। স্থানীয় সূত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, হামলার আগে আকাশে যুদ্ধবিমানের শব্দ শোনা যায় এবং পরে বিস্ফোরণের পর হাসপাতাল ভবনে আগুন ধরে যায়। টেলিভিশন ফুটেজে দমকল বাহিনীকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করতে দেখা গেছে। ঘটনার পর উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের উদ্ধারে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা এবং হামলার দায়-দায়িত্ব নিয়ে দুই পক্ষের বিপরীতমুখী বক্তব্যের কারণে পরিস্থিতি নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক অভিযানে ইসরায়েলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে মোট ৫৪টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসিও এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। আইআরজিসির এক বিবৃতিতে বলা হয়, হামলায় খোররামশাহর সুপার-হেভি ক্ষেপণাস্ত্র, খায়বার-শাখান, কদর ও এমাদ মডেলের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের পাশাপাশি প্রথমবারের মতো কৌশলগত জ্বালানি চালিত সেজিল ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে। উল্লেখ করা হয়, সেজিল একটি মাঝারি পাল্লার সারফেস-টু-সারফেস ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনা থেকে ইসরায়েলের তেল আবিব পর্যন্ত দূরত্ব অল্প সময়ের মধ্যেই অতিক্রম করতে সক্ষম। এদিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের ঘটনা তারা শনাক্ত করেছে। আগের হামলার খবর প্রকাশের দুই ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে এই নতুন আক্রমণ সংঘটিত হয়েছে বলে তাদের দাবি। উল্লেখ্য, গত ১৭ দিন ধরে ইরানকে লক্ষ্য করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘাতে ইরানে নিহতের সংখ্যা ইতোমধ্যে দুই হাজার ছাড়িয়েছে এবং আহত হয়েছেন সহস্রাধিক মানুষ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে নিশানা করার অঙ্গীকার করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। আজ রোববার ( ১৫ মার্চ) ইআরজিসির নিজস্ব ওয়েবসাইট ‘সেপাহ নিউজ’-এ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে নেতানিয়াহু সম্পর্কে বলা হয়, ‘আমরা পূর্ণ শক্তি দিয়ে তাঁকে ধাওয়া ও হত্যা করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব।’ দুই সপ্তাহ আগে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতনের ডাক দিয়ে দেশটির সঙ্গে এ যুদ্ধ শুরু করেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিন অর্থাৎ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হন দীর্ঘ ৩৭ বছর ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বে থাকা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তাঁর মৃত্যুর পর দ্বিতীয় পুত্র আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে নেতানিয়াহুকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ও হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেমের বিরুদ্ধে ইসরায়েল কী ব্যবস্থা নিতে পারে? জবাবে তিনি বলেছেন, ‘আমি এই ‘‘সন্ত্রাসী’’ নেতাদের কারোরই জীবনবিমার নিশ্চয়তা দেব না।’