অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের ঘোষিত সম্পদের পূর্ণাঙ্গ বিবরণী প্রকাশ করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত এই নথিতে গত অর্থবছরের শেষ দিন, অর্থাৎ ৩০ জুন পর্যন্ত উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সংশ্লিষ্টদের আর্থিক ও অনার্থিক সম্পদের হিসাব তুলে ধরা হয়েছে।
বিবরণী অনুযায়ী, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫ কোটি ৬২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৫ টাকা, যা এক বছরে প্রায় ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। সঞ্চয়পত্র নগদায়ন, ব্যাংক আমানত বৃদ্ধি ও উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত শেয়ারের কারণে এই সম্পদ বৃদ্ধি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর কোনো আর্থিক দায় নেই। তবে তাঁর স্ত্রী আফরোজী ইউনূসের মোট সম্পদ একই সময়ে কমে ১ কোটি ২৭ লাখ টাকায় নেমেছে এবং তাঁর নামে প্রায় ১৭ লাখ টাকার দায় রয়েছে।
প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, উপদেষ্টা পরিষদের বেশিরভাগ সদস্যের সম্পদ গত এক বছরে বৃদ্ধি পেয়েছে, আবার কয়েকজনের ক্ষেত্রে সম্পদ হ্রাসের তথ্যও উঠে এসেছে। অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানসহ একাধিক উপদেষ্টার সম্পদের উৎস হিসেবে ব্যাংক আমানত, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি, বিনিয়োগ আয় ও পেশাগত আয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৩ সালের আয়কর আইনে নির্ধারিত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারেই আর্থিক ও অনার্থিক সম্পদের শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে। আর্থিক সম্পদের মধ্যে নগদ অর্থ, ব্যাংক আমানত, সঞ্চয়পত্র ও শেয়ার অন্তর্ভুক্ত, আর অনার্থিক সম্পদের মধ্যে রয়েছে জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাটসহ স্থাবর সম্পত্তি।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্বচ্ছতার অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রধান উপদেষ্টা। দীর্ঘ অপেক্ষার পর আজ উপদেষ্টা পরিষদের ২১ সদস্যসহ বিশেষ সহকারী ও উপদেষ্টা পদমর্যাদায় দায়িত্বপ্রাপ্তদের সম্পদের তথ্য একযোগে প্রকাশ করা হলো।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদে গণভোটকে সামনে রেখে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক আচরণে সংযম, দায়িত্বশীলতা ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা ৭টায় প্রচারিত ভাষণে তিনি বলেন, নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, বিজয় ও পরাজয়—উভয়ই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অনুষঙ্গ। ব্যক্তিগত কিংবা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে রাষ্ট্র ও জাতির বৃহত্তর কল্যাণে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। নির্বাচনের পর সম্মিলিতভাবে একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন প্রধান উপদেষ্টা। ভাষণে তিনি উল্লেখ করেন, একদিন পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সংসদ নির্বাচন ও গণভোট দেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার সাংবিধানিক প্রকাশ ঘটতে যাচ্ছে এই নির্বাচনের মাধ্যমে। তিনি বলেন, এটি শুধু জনপ্রতিনিধি বাছাইয়ের প্রক্রিয়া নয়, বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। প্রধান উপদেষ্টা জানান, এবারের নির্বাচন আগের যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হওয়ার পথে রয়েছে, যদিও প্রচারকালীন কিছু সহিংস ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় সরকার গভীরভাবে শোকাহত। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের সহিংসতা গ্রহণযোগ্য নয় এবং এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে। নির্বাচনের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। রেকর্ডসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসম্পন্ন সশস্ত্র বাহিনী, সিসিটিভি, বডি ক্যামেরা, ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই—ভোটাররা যেন নির্ভয়ে ও মর্যাদার সঙ্গে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। তিনি প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি এবং সরকারি দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি ও আইনি হেফাজতে থাকা যোগ্য নাগরিকদের জন্য পোস্টাল ব্যালট চালুর বিষয়টি গণতন্ত্রের পরিসর সম্প্রসারণের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের উদ্দেশে তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা, ভয়ভীতি, কেন্দ্র দখল কিংবা গুজব ছড়ানোর চেষ্টা রাষ্ট্র কঠোরভাবে দমন করবে। একই সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে দায়িত্ব হস্তান্তর না করার অপপ্রচারকে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করে আশ্বস্ত করেন, নির্বাচিত সরকারের কাছে দ্রুততম সময়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করেই অন্তর্বর্তী সরকার তার দায়িত্ব শেষ করবে। জুলাই জাতীয় সনদের প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এটি কোনো একক দলের দলিল নয়; বরং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার ভিত্তিতে গৃহীত একটি জাতীয় ঐকমত্যের ফল। গণভোটের মাধ্যমে জনগণ সরাসরি রাষ্ট্র সংস্কারের দিকনির্দেশনা নির্ধারণের সুযোগ পাচ্ছে, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক। ভাষণের শেষাংশে তিনি ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই ভোট শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রাষ্ট্রের পথনির্দেশ নির্ধারণ করবে। দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের মাধ্যমেই গণতান্ত্রিক উত্তরণকে টেকসই করা সম্ভব।
অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, শেষ হাসিনা সরকারের আমলে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করা গেলেও তা ফেরত আনা সহজ হবে না। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে তিনি বলেন, দক্ষ পদ্ধতিতে সম্পন্ন হওয়ায় অর্থ উদ্ধার প্রক্রিয়া জটিল। তবে পরবর্তী সরকার যদি সক্রিয় হয়, তবেই অর্থ ফেরত আনা সম্ভব। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যে উন্নয়নমূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে, তা পরবর্তী সরকারের দ্বারা অব্যাহত রাখা উচিত। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে তার সম্পদের হিসাব জমা দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন। সালেহউদ্দিন আশা প্রকাশ করেন, নতুন সরকার এসব বিষয়ে কোনো আইনি জটিলতার সম্মুখীন হবে না। নিজের দায়িত্বকাল মূল্যায়ন করে তিনি বলেন, “উপদেষ্টা হিসেবে নিজেকে ১০০-এর মধ্যে ৭০ নম্বর দেব। অনেক কিছু করা সম্ভব হয়নি।” তিনি আরও জানান, দুই-এক দিনের মধ্যে উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণী মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত হবে। এছাড়া, নির্বাচিত সরকার চাইলে বর্তমান উপদেষ্টা পরিষদের সময়ে অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশের সুযোগ থাকবে।
হাইকোর্ট বিভাগের নাইমা হায়দার বিচারপতি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট সূত্রে জানা গেছে, বিচারপতি নাইমা হায়দার স্বেচ্ছায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ ফেব্রুয়ারি তিনি নিজ স্বাক্ষরিত পত্রের মাধ্যমে প্রধান বিচারপতির কাছে পদত্যাগপত্র দাখিল করেন, যা পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতির নিকট পাঠানো হয়েছে। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বিষয়টি আনুষ্ঠা নিকভাবে নিশ্চিত করেন আপিল বিভাগের গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম। বিচারপতি নাইমা হায়দার একজন জ্যেষ্ঠ আইনবিদ ও সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীর কন্যা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলএম ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এ ছাড়া অক্সফোর্ড, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া (বার্কলি) এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর শিক্ষায় অংশ নেন। আইন পেশায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নাইমা হায়দার ১৯৮৯ সালে জজ কোর্টে আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। পরবর্তীতে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে ২০০৯ সালে হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি এবং ২০১১ সালে স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান।