খুলনা–মোংলা মহাসড়কে নৌবাহিনীর স্টাফ বাস ও বরযাত্রীবাহী একটি মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নবদম্পতি, শিশুসহ ১৪ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুতে বাগেরহাটের মোংলা উপজেলায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। নিহতদের মধ্যে স্থানীয় বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাক ও তার পরিবারের একাধিক সদস্য থাকায় পুরো এলাকায় শোকাবহ পরিবেশ বিরাজ করছে।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকেলে রামপাল উপজেলার বেলাইব্রিজ এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানা যায়, মোংলা থেকে ছেড়ে আসা নৌবাহিনীর স্টাফ বাসটি খুলনার দিকে যাচ্ছিল। বিপরীত দিক থেকে আসা বরযাত্রীবাহী মাইক্রোবাসটির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে উভয় যানবাহনের সামনের অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ঘটনাস্থলেই কয়েকজন প্রাণ হারান।
নিহতদের মধ্যে ৯ জন মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের পরিবারের সদস্য। তাদের মরদেহ মোংলায় আনা হয়েছে এবং ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে জুমার নামাজের পর উপজেলা মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে চারজনের মরদেহ স্বজনরা গ্রহণ করেছেন; তাদের জানাজা ও দাফন খুলনার কয়রা উপজেলায় সম্পন্ন করা হবে।
রামপাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল-মামুন জানান, দুর্ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করেন এবং আহতদের রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। তবে গুরুতর আঘাতের কারণে অনেকেরই প্রাণহানি ঘটে।
এদিকে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন ও পুলিশ সুপার মো. হাসান চৌধুরী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। একই সঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন।
বিয়ের সাজে নতুন বউকে নিয়ে ঘরে ফেরার কথা ছিল, সামনে ছিল পরিবারের সাথে প্রথম ইফতারের আনন্দ। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে মোংলার কাছেই থমকে গেল সেই পথ। বাগেরহাটের রামপালে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় বর-কনেসহ প্রাণ হারালেন ১৪ জন। এর মধ্যে বরের পরিবারেরই ৯ সদস্য। আজ জুমার নামাজের পর মোংলায় পাশাপাশি কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হলো তাদের। বিয়ের আনন্দ নিয়ে ফেরা গাড়িটি পরিণত হলো মৃত্যুফাঁদে। নতুন বউ, বর আর স্বজনদের হাসিতে ভরা সেই যাত্রার সমাপ্তি হলো এক মুহূর্তের বিভীষিকায়। রাতভর অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনে কেঁপে ওঠা মোংলা শহর আজ বিষাদ আর নিস্তব্ধতায় ঢাকা। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন বর আহাদুর রহমান ছাব্বির, তাঁর বাবা আব্দুর রাজ্জাক, ভাই আব্দুল্লাহ সানি, বোন উম্মে সুমাইয়া ঐশী, ভাবি ফারহানা সিদ্দিকা পুতুল এবং চার শিশু সদস্য সামিউল ইসলাম ফাহিম, আলিফ, আরফা ও ইরাম। এক মুহূর্তের দুর্ঘটনায় বিলীন হয়ে গেল একটি পরিবারের প্রায় পুরো প্রজন্ম। অন্যদিকে, কনে মার্জিয়া আক্তার মিতু, তাঁর ছোট বোন লামিয়া আক্তার, দাদি রাশিদা বেগম ও নানি আনোয়ারা বেগমের মরদেহ নেওয়া হয়েছে খুলনার কয়রায়। এছাড়া নিহত হয়েছেন মাইক্রোবাস চালক নাঈম। আইনি প্রক্রিয়া শেষে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। শুক্রবার ভোরে মোংলার শেহলাবুনিয়ায় পৌঁছালে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। সকাল থেকেই রাজ্জাকের বাড়িতে ভিড় জমান শোকাতুর এলাকাবাসী। বুধবার রাতে খুলনার কয়রা উপজেলার মার্জিয়া আক্তারের সঙ্গে বিয়ে হয় মোংলা পৌর বিএনপি সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে ছাব্বিরের। বৃহস্পতিবার নতুন বউ নিয়ে ফেরার পথে রামপালের বেলাইবিজ এলাকায় নৌবাহিনীর একটি বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ১৪ জন। শুক্রবার জুমার নামাজের পর মোংলা উপজেলা পরিষদ চত্বরে অনুষ্ঠিত হয় জানাজা। এরপর পৌর কবরস্থানে পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয় রাজ্জাক পরিবারের ৯ সদস্যকে। বিয়ের আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই কবরের সারিতে ঠাঁই হলো তাদের। ইফতারের টেবিলে যাদের অপেক্ষায় ছিল প্রিয়জন, তারা ফিরলেন না আর— ফিরলো শুধু তাদের নিথর দেহ।
বাগেরহাটের রামপালে নৌবাহিনীর স্টাফ বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে নারী ও শিশুসহ ১৪ জন নিহতের ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। শুক্রবার (১৩ মার্চ) রাতে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মোঃ বাতেন এ তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটিকে আগামী দশ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গঠিত কমিটির প্রধান করা হয়েছে বাগেরহাটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মেজবাহ উদ্দীনকে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, মোংলা ও রামপাল অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)-এর একজন পরিদর্শক। জেলা প্রশাসক গোলাম মোঃ বাতেন জানান, খুলনা-মোংলা মহাসড়কের বেলাই ব্রিজ এলাকায় সংঘটিত এই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের জন্য জেলা প্রশাসন, পুলিশ বিভাগ ও বিআরটিএর সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, দুর্ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে এবং কারও অবহেলা রয়েছে কি না এসব বিষয় খতিয়ে দেখে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে কারও অবহেলা প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাগেরহাটের রামপালে বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকেল সাড়ে চারটার দিকে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৮ জন নিহত হয়েছেন। ঘটনা ঘটে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের বেলাইব্রিজ এলাকায়। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, মোংলা থেকে আসা একটি বাস বেলাইব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা মোংলাগামী মাইক্রোবাসটির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। উভয় গাড়ির সামনের অংশ দুমড়েমুচড়ে গেলে ঘটনাস্থলেই কয়েকজন নিহত হন। স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, নিহত ও আহতদের মধ্যে কয়েকজন মিলে ওই মাইক্রোবাসে করে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে মোংলা ফিরছিলেন। হতাহতদের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে, কারণ কিছু আহতের অবস্থা আশঙ্কাজনক। রামপাল থানার পুলিশ দুর্ঘটনার কারণ ও নিহতদের পরিচয় নির্ধারণে তদন্ত শুরু করেছে।