সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সাইবার অপরাধ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, আর এর প্রধান শিকার হয়ে উঠেছে তরুণ ও শিক্ষার্থীরা। স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন গেম কিংবা বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার—এইসব প্রযুক্তিনির্ভর দৈনন্দিন অভ্যাসই এখন তাদের ঝুঁকিতে ফেলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়লেও সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বাড়েনি। ফলে প্রতারণা, ফিশিং, হ্যাকিং, ভুয়া লিংকে ক্লিক করে তথ্য চুরি, ব্ল্যাকমেইলিং, ফেক আইডি তৈরি করে হয়রানি কিংবা ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার মতো অপরাধ অহরহ ঘটছে।
বিশেষ করে টিনএজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সহজেই টার্গেটে পরিণত হচ্ছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, কিংবা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্বের ফাঁদে পড়ে অনেকেই নিজেদের তথ্য দিয়ে দিচ্ছে। এরপরে শুরু হয় প্রতারণা। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ছাত্রীদের ছবি বা ভিডিও এডিট করে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা চলছে, যা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে ভুক্তভোগীদের।
শুধু সামাজিক হয়রানি নয়, আর্থিক প্রতারণার ঘটনাও বাড়ছে। শিক্ষার্থীরা ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইন ইনকাম বা স্কলারশিপের প্রলোভনে পড়ে ভুয়া ওয়েবসাইটে তথ্য দিয়ে দিচ্ছে কিংবা অর্থ জমা দিচ্ছে—যার মাধ্যমে তারা প্রতারণার শিকার হচ্ছে।
অপরদিকে, গেমিং অ্যাডিকশন বা ডার্ক ওয়েব নিয়ে আগ্রহী হয়ে অনেক তরুণই নিজেই জড়িয়ে পড়ছে সাইবার অপরাধে। এটি শুধু তাদের ভবিষ্যতের জন্যই হুমকি নয়, বরং দেশের সাইবার নিরাপত্তাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, তারা সাইবার ক্রাইম ইউনিটের মাধ্যমে এসব অপরাধ চিহ্নিত ও দমন করার চেষ্টা করছে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদেরও হতে হবে সচেতন। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখা, অপরিচিত লিংক বা অ্যাপ এড়িয়ে চলা, সোশ্যাল মিডিয়ায় সীমিত তথ্য শেয়ার করা এবং সন্দেহজনক বার্তা পেলে সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো—এই কিছু সাধারণ পদক্ষেপই অনেক বড় বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সাইবার সচেতনতা বিষয়ক কর্মশালা চালু করা, অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং জাতীয় পর্যায়ে একটি কার্যকর কৌশল তৈরি করাও জরুরি হয়ে উঠেছে। কেননা, তরুণ প্রজন্ম যদি ভয় বা অনিরাপত্তায় ভোগে, তাহলে তা দেশের ভবিষ্যতের জন্য এক অদৃশ্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
প্রযুক্তির জগতে এগিয়ে যেতে হলে শুধু প্রযুক্তি জানলেই হবে না—নিরাপদ থাকা ও অন্যকে নিরাপদ রাখা, দুটোই একসঙ্গে শিখতে হবে। তরুণদের ডিজিটাল সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এখনই সময় সম্মিলিতভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার।
ঢাকার কেরানীগঞ্জের রাস্তায় কর্মস্থলগামী এক কারারক্ষী ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন। ভুক্তভোগী সাথী আক্তার (৩০) বুধবার (৭ জানুয়ারি) সকাল সোয়া ৬টার দিকে মুজাহিদনগর আন্ডারপাসে অজ্ঞাতনামা ৩-৪ ছিনতাইকারীর হাতে দেশীয় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তার স্বর্ণের চেইন, এক জোড়া কানের দুল, মোবাইল ফোন এবং পাঁচ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। তিনি চিৎকার করলে ছিনতাইকারীরা পালিয়ে যায়। ভুক্তভোগী কারাগারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরামর্শে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। থানার ওসি সাইফুল ইসলাম জানান, ঘটনার তদন্ত চলছে এবং দ্রুত দোষীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।
দেশজুড়ে অনলাইনে প্রশ্নপত্র ফাঁসের একটি সংঘবদ্ধ চক্র ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছে পুলিশের সাইবার ইউনিট। বিশেষ করে চাকরি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাকে ঘিরে এই চক্র নতুন কৌশলে প্রতারণা চালাচ্ছে। সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে এই চক্রের ৫ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের ডিজিটাল অপরাধ দমন শাখা (Cyber Crime Investigation Division)। পুলিশ জানায়, অভিযুক্তরা মোবাইল অ্যাপ, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম (যেমন: টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ) এবং ফেসবুক পেইজের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজব ছড়িয়ে প্রার্থীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছিল। সাইবার ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার তানভীর হাসান বলেন, “এই চক্র প্রযুক্তির অপব্যবহার করে পরীক্ষার্থীদের মিথ্যা আশ্বাস দিচ্ছিল। তাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও প্রতারণা আইনে মামলা হয়েছে।” ‘গ্যারান্টি’ দিয়ে বিক্রি হতো ভুয়া প্রশ্নপত্র প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, চক্রটি মূলত দুটি ধাপে কাজ করত—প্রথমে তারা ফেসবুকে ‘ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন’ বা ‘সরকারি চাকরি প্রশ্ন ফাঁস’ নামে কিছু গ্রুপ চালু করত। সেসব গ্রুপে বিজ্ঞাপন দিয়ে দাবি করত, পরীক্ষার আগেই তারা “আসল প্রশ্নপত্র” দিতে পারবে। দ্বিতীয় ধাপে, আগ্রহী প্রার্থীদের সঙ্গে গোপন চ্যাটে কথা বলে বিকাশ/নগদে টাকা সংগ্রহ করত। অনেক সময় তারা আগের বছরের প্রশ্ন বা সাজানো প্রশ্ন ‘নমুনা’ হিসেবে পাঠিয়ে বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করত। পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে বেশ কিছু ফেক অ্যাকাউন্টের তথ্য, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও সিমকার্ড জব্দ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. মাহবুবা হোসেন বলেন, “ভয়াবহ বিষয় হলো—তরুণ প্রজন্ম এখন অনলাইন প্রতারণাকে সহজলভ্য করে দেখছে। প্রশ্ন ফাঁসের গুজবের পেছনে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপও বড় কারণ।” আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হুঁশিয়ারি ও পরামর্শ পুলিশ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক অভিযানে ধরা পড়া ব্যক্তিরা অন্তত তিনটি বড় পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে শতাধিক পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আদায় করেছে। শুধু গত দুই মাসেই তারা প্রায় ১৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে দাবি পুলিশের। ডিজিটাল অপরাধ দমন শাখা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের নামে কোনো ধরনের লেনদেনে জড়ানো সম্পূর্ণ বেআইনি। এমন প্রতারণার শিকার হলে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের সাইবার হেল্পলাইনে (৯৯৯ বা সাইবার পোর্টাল) জানাতে বলা হয়েছে। তাদের মতে, এই ধরনের চক্রকে প্রতিরোধ করতে হলে অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। অনেক সময় পরীক্ষার্থীরা মানসিক চাপে পড়ে শর্টকাট খুঁজতে গিয়ে প্রতারণার ফাঁদে পড়ে যায়। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড ইতোমধ্যে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, “প্রশ্নপত্র ফাঁস বলে কোনো ব্যবস্থা বা সংযোগ বাস্তবে নেই। কেউ এ ধরনের গুজবে কান দেবেন না। বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করুন।” পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চক্রটি আরও বড় পরিসরে বিস্তার লাভ করছিল। গ্রেপ্তারকৃতদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন জেলায় সক্রিয় আরও কিছু সদস্যের খোঁজ চলছে। তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চাকরির প্রতারণার ফাঁদে শতাধিক যুবক-যুবতী বর্তমানে চাকরি পাওয়া যেমন কঠিন হয়ে উঠেছে, তেমনি বেড়েছে ভুয়া চাকরির প্রতারণা। সাম্প্রতিক এক ঘটনায় দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শতাধিক যুবক-যুবতী এক ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ে হয়েছেন প্রতারিত। চাকরির আশায় তারা টাকা দিয়েও এখন কাজের মুখ দেখেননি। বরং হারিয়েছেন সময়, অর্থ ও আত্মবিশ্বাস। ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানী ঢাকায়। একটি কথিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে ফেসবুক ও বিভিন্ন চাকরির ওয়েবসাইটে আকর্ষণীয় চাকরির বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। বলা হয়—“বিনা অভিজ্ঞতায় ২০,০০০ টাকা বেতনে কর্পোরেট অফিসে চাকরি, শুধু ইন্টারভিউ দিলেই হবে।” এই বিজ্ঞাপনের প্রলোভনে অনেক তরুণ-তরুণী আবেদন করেন। পরে ফোনে ডেকে আনা হয় অফিসে, নেওয়া হয় ৫০০–২০০০ টাকা “প্রসেসিং ফি” নামে। ইন্টারভিউ নেওয়ার নামে দীর্ঘ সময় বসিয়ে রাখা হয়, কথিত প্রশিক্ষণের নামে আরও টাকা চাওয়া হয়। কেউ কেউ মাসখানেক কাজ করেও বেতন পাননি। অবশেষে প্রতিষ্ঠানটির অফিস হঠাৎ করেই বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফোন নম্বরগুলো বন্ধ, আর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পলাতক। এই ধরনের ঘটনা দেশে নতুন নয়। প্রতিনিয়ত চাকরির নামে এ ধরনের প্রতারণা বেড়েই চলেছে। সবচেয়ে বিপদে পড়ছেন সদ্য গ্র্যাজুয়েট তরুণ-তরুণীরা, যাদের হাতে অভিজ্ঞতা নেই, আর স্বপ্ন রয়েছে অনেক।