ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নীলফামারী-৪ আসনে ভোটের উত্তাপ তীব্র হচ্ছে। দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীরা এবার পরস্পর মুখোমুখি, ফলে ভোটের মাঠে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের সময় এই আসনে জাতীয় পার্টির আঞ্চলিক ভোট ব্যাংক তৈরি হয়েছিল। ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হয়ে জাতীয় পার্টির দুর্গ ভেঙে দেন। বর্তমানে জামায়াত তাদের ভোটার আস্থা কাজে লাগিয়ে নতুন ভোট ব্যাংক তৈরি করতে মরিয়া। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী দলটির সমীকরণ আরও জটিল করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভোটের চূড়ান্ত লড়াই হবে বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীর মধ্যে। ভোটারদের দৃষ্টিকোণ এবং প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করবে কে জয়ী হবে।
জাতীয় পার্টি আসনটি পুনরুদ্ধারের জন্য সাবেক এমপি ও শিল্পপতিকে প্রার্থী করেছে। মাঠে তিনি নেতাকর্মীদের উদ্যমী করেছেন এবং ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করছেন। তবে কিছু প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে না পারায় দলের কিছু ভোটার অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
নীলফামারী-৪ আসনটি কিশোরগঞ্জের ৯টি ইউনিয়ন এবং সৈয়দপুরের ১টি পৌরসভা ও ৫টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এই আসনে মোট ৯ জন প্রার্থী মনোনয়ন পেয়ে প্রতীক নিয়ে ভোটের মাঠে রয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপি ধানের শীষে অধ্যক্ষ আব্দুল গফুর সরকার, জামায়াত দাঁড়িপাল্লায় হাফেজ আব্দুল মুনতাকিম, জাতীয় পার্টি লাঙলে সিদ্দিকুল আলম প্রার্থী। এছাড়া হাতপাখা, ফুটবল, মোটরসাইকেল, ঘোড়া, কাঁচি, কাঁঠাল প্রতীকের প্রার্থীরাও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান খোলনায় নির্বাচনী প্রচারণার সময় এক রাজনৈতিক দলের নারী ও শ্রমিকদের প্রতি অসম্মানজনক মনোভাবকে কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, দেশ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে নারী সমাজের সম্পৃক্ততা অনিবার্য, কারণ দেশের প্রায় ২০ কোটি মানুষের অর্ধেকই নারী। নারী নেতৃত্বকে অবমূল্যায়ন এবং কর্মজীবী নারীদের অসম্মান করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী প্রচারণার অংশ নিতে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান খুলনা নির্বাচনী মঞ্চে বক্তব্য রাখছেন। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা থেকে বেলা ১১টা ১০ মিনিট হেলিকপ্টার যোগে খুলনার উদ্দেশে রওনা করেন। বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, গার্মেন্টস খাতে প্রায় ৫০ লাখ নারী কর্মরত, যারা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। কোনো রাজনৈতিক দল যদি তাদের ঘরে আটকে রাখতে চায়, তবে তা দেশের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করবে। জামায়াত আমিরের নারীদের বিষয়ে বিতর্কিত মন্তব্যকে উদাহরণ দেখিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে আইডি হ্যাকের দাবি মিথ্যা ও উদ্দেশ্যমূলক, যা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা। তারেক রহমান সতর্ক করেছেন, যারা মানুষের আত্মসম্মান ও নারীর মর্যাদা উপেক্ষা করে, তারা দেশের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে সক্ষম নয়। সমাবেশে তিনি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর স্ত্রী বিবি খাদিজার কর্মমুখী চরিত্রকে স্মরণ করিয়ে দেশের নারীর ক্ষমতায়নের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেন। এমনি বক্তব্যের মাধ্যমে বিএনপি চেয়ারম্যান নারীদের অধিকার ও নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন নিশ্চিত করেছেন এবং ভোটারদের ন্যায়সংগত ও সচেতন নির্বাচনী অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের বিএনপি প্রার্থী ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বাংলাদেশকে এগোতে দিতে চায় না জামায়াতে ইসলামী এবং তারা দেশটিকে আফগানিস্তানের মতো করতে চায়। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) নিজের নির্বাচনী এলাকায় জনসংযোগকালে তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াত নারীদের কর্মসংস্থানে বাধা দিচ্ছে এবং মেয়েদের ঘরে বসিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। তিনি জামায়াত আমিরের সাম্প্রতিক একটি সোশ্যাল মিডিয়া মন্তব্যকেও নারীবিদ্বেষী উল্লেখ করে নিন্দা জানান। ফখরুল আরও অভিযোগ করেন, জামায়াত হিন্দু সম্প্রদায়কে হুমকি দিচ্ছে। তিনি সবাইকে নির্ভয়ে চলার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দেশে এখন ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ এসেছে এবং বিএনপি সব দলকে নিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করছে। ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “দেশ এখন আপনার হাতে, তাই ভোটে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।” এ সময় উপস্থিত ছিলেন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পঞ্চগড়-২ (বোদা–দেবীগঞ্জ) আসনের বোদা উপজেলার সাকোয়া ইউনিয়ন থেকে চারজন প্রার্থী সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ফলে ইউনিয়নের ভোটারদের মধ্যে তৈরি হয়েছে দ্বিধা ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) সাকোয়া ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, প্রার্থীদের নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে গর্ব থাকলেও প্রকাশ্যে কারো পক্ষে অবস্থান নিতে অনাগ্রহী সাধারণ ভোটাররা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা জানান, এক প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাইলে অন্যদের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই নীরব ভূমিকা পালন করছেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সাকোয়া ইউনিয়ন থেকে জামায়াতে ইসলামীর সফিউল্লাহ সুফি (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির লুতফর রহমান রিপন (লাঙ্গল), কমিউনিস্ট পার্টির আশরাফুল ইসলাম (কাস্তে) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহমুদ হোসেন সুমন (ঘোড়া) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রার্থীদের বাড়ি সাকোয়া বাজারের এক কিলোমিটারের মধ্যেই এবং সবাই পরস্পরের আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতজন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নির্বাচনের পর ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তারা প্রকাশ্যে ভোটের পক্ষে প্রচারণা এড়িয়ে চলছেন। উল্লেখ্য, এ আসনে এসব প্রার্থীর পাশাপাশি বিএনপি, জাসদ, সুপ্রিম পার্টিসহ আরও চারজন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।