হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে আবারও সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার ইঙ্গিত মিলেছে। ওমানের উত্তরাঞ্চলে একটি মার্কিন পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজকে ইরানের নৌযানগুলো ধাওয়া করেছে—এমন তথ্য দিয়েছে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক ঝুঁকি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ভ্যানগার্ড।
সংস্থাটির দাবি অনুযায়ী, ‘স্টেনা ইম্পেরেটিভ’ নামের ট্যাংকারটি আন্তর্জাতিক নৌপথে চলাচল করছিল এবং ইরানের স্বীকৃত জলসীমায় প্রবেশ করেনি। এ অবস্থায় কয়েকটি ইরানি গানবোট জাহাজটির কাছে এসে ইঞ্জিন বন্ধ করে থামার নির্দেশ দেয় এবং জাহাজে ওঠার প্রস্তুতিও নেয়। তবে ট্যাংকারটি গতি বাড়িয়ে পরিস্থিতি এড়িয়ে যায়। পরে একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ জাহাজটিকে নিরাপত্তা দিয়ে নির্ধারিত পথে এগিয়ে নেয়।
মঙ্গলবার (৪ ফেব্রুয়ারি) রাতে এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।
এ ঘটনার আগে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন্স (ইউকেএমটিও) জানায়, ওমান উপকূল থেকে প্রায় ১৬ নটিক্যাল মাইল দূরে সশস্ত্র নৌযানের একটি দল একটি বাণিজ্যিক জাহাজ আটকের চেষ্টা করেছিল। ঘটনাটি হরমুজ প্রণালির ট্রাফিক সেপারেশন স্কিমের ভেতরে ঘটেছে বলে জানানো হলেও সংশ্লিষ্ট জাহাজের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানায় সংস্থাটি।
অন্যদিকে ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ ইরানি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, একটি জাহাজ প্রয়োজনীয় আইনি অনুমতি ছাড়া ইরানের জলসীমায় প্রবেশ করেছিল। সতর্ক করার পর সেটি এলাকা ত্যাগ করে এবং কোনো নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেনি।
উল্লেখ্য, হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট। পারস্য উপসাগরের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর অধিকাংশ অপরিশোধিত তেল এই পথ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে। ফলে এই অঞ্চলে যেকোনো সামরিক বা নিরাপত্তাজনিত উত্তেজনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরান জানিয়েছে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী এখনো আন্তর্জাতিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত থাকবে, তবে সব নৌযানকে চলার আগে তেহরান সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও)-র সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাজ্যে ইরানের রাষ্ট্রদূত আলী মুসাভি এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইরান সামুদ্রিক নিরাপত্তা উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এবং দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত, তবে প্রণালী শুধুমাত্র তাদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত রাষ্ট্রের জন্য বন্ধ থাকবে। মুসাভি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উত্তেজনামূলক কার্যকলাপকে এই অঞ্চলের নৌ-চলাচলের ঝুঁকির মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের শর্তসাপেক্ষ অনুমতি আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ কমানোর কৌশল। বিকল্প নিরাপদ নৌপথের অভাবে হরমুজ প্রণালী সচল থাকা বিশ্ব তেলের বাজারের জন্য অত্যন্ত জরুরি। তবে শর্ত মেনে পশ্চিমা দেশগুলো তাদের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত। হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এবং সমন্বয় প্রক্রিয়া এখন বিশ্বজ্বালানি নিরাপত্তার মূল ফোকাসে পরিণত হয়েছে।
ইরানের আধাসামরিক বাহিনী রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) মুখপাত্র শুক্রবার (২০ মার্চ) জানিয়েছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দাবি যে তেহরান এখন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে অক্ষম, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। জেনারেল আলী মোহাম্মদ নায়েইনি ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইরান’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানান, দেশটি নিয়মিতভাবে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি এবং মজুদ বাড়াচ্ছে। তিনি আরও বলেন, “যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতেও ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পে কোনো ধরণের সমস্যা সম্মুখীন হচ্ছে না। আমাদের উৎপাদন এখনো উচ্চমানের এবং ধারাবাহিক।” জেনারেল নায়েইনি ইরানের শিক্ষাব্যবস্থার নিখুঁত ফলাফল এবং ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পের উন্নত সক্ষমতার মধ্যে তুলনা টানেন। তদন্তকারীরা মনে করছেন, এই বিবৃতির মাধ্যমে তেহরান ইসরায়েল ও তার মিত্র দেশগুলোকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, যুদ্ধ এবং সামরিক প্রস্তুতি চলমান থাকবে যতক্ষণ না ইরানের নিরাপত্তা ও প্রভাব নিশ্চিতভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে।
ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের গোয়েন্দা প্রধানকে লক্ষ্য করা হয়েছে, তবে তার প্রাণহানির তথ্য নিশ্চিত হয়নি। কাতারের আল জাজিরা জানিয়েছে, এই অভিযান ইসরায়েলের পক্ষ থেকে পরিচালিত হলেও আঘাতের পরিমাণ ও ফলাফল এখনো যাচাই চলছে। ইরান থেকে পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে তেল আবিব ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে, এতে অন্তত দুজন নিহত এবং অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশেষত রামাত গানে একটি রকেট সরাসরি বসবাসস্থানে আঘাত হানে, যেখানে ৭০ বছরের একটি দম্পতির মৃত্যু হয়। হামলায় তেল আবিবের একটি রেলস্টেশনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, নিরাপত্তার কারণে ট্রেন চলাচল সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও হিজবুল্লাহর অন্তত শতাধিক রকেট ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। সংঘাতের এই জটিল পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।