আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে বরিশালে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ভোটের দিন পুলিশ, সেনাবাহিনী, র্যাব, বিজিবি, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড ও আনসারসহ প্রায় ১৬ হাজার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মাঠে সক্রিয় থাকবেন। তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে পুরো জেলা।
তবে এত প্রস্তুতির মধ্যেও জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনের একাধিক প্রার্থী সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। গত কয়েক দিনে বিভিন্ন আসনের প্রার্থীরা সংবাদ সম্মেলন করে ভোটারদের ভয়ভীতি, এজেন্টদের হুমকি এবং প্রশাসনের পক্ষপাতমূল আচরণের অভিযোগ তুলেছেন।
বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) বরিশাল প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে বরিশাল-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী রাজিব আহসান অভিযোগ করেন, বাইরের আসন থেকে জামায়াতের নেতাকর্মীরা তার এলাকায় অবস্থান করায় আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। একইদিন বরিশাল-৬ আসনের জামায়াত প্রার্থী মাওলানা মাহমুদুন্নবী তালুকদার প্রশাসনের উদাসীনতা ও পক্ষপাতের অভিযোগ করেন। বরিশাল-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার সোবহান ভোটার ও এজেন্টদের ভয় দেখানোর অভিযোগ তুলে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
এছাড়া বরিশাল-৩ আসনের ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদসহ একাধিক প্রার্থী ভোটের দিন সহিংসতা ও বাধার আশঙ্কার কথা জানান। জেলার বিভিন্ন স্থানে পাল্টাপাল্টি মামলা ও হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে সাংবাদিকদের অভিযোগ, সব বৈধ কাগজপত্র দাখিলের পরও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে পর্যবেক্ষণ কার্ড না দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে, যা নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, সাধারণ কেন্দ্রে দুইজন ও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে তিনজন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। জেলার বিভিন্ন স্থানে ৯৯টি মোবাইল টিম, ১২টি স্ট্রাইকিং টিম, সেনাবাহিনীর টহল দল, বিজিবির ১৪ প্লাটুন এবং র্যাবের বিশেষ টিম মোতায়েন থাকবে। নদীবেষ্টিত এলাকায় নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের টহল জোরদার করা হয়েছে।
বরিশাল জেলা নির্বাচন অফিস জানায়, জেলার ছয়টি আসনে মোট ৮৩৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ ও অতিগুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বরিশাল-৩ (মুলাদী–বাবুগঞ্জ) আসনে উত্তেজনা বাড়ছে। নির্বাচনের একদিন আগে জাতীয় পার্টির মুলাদী উপজেলা সদস্য সচিব মোহাম্মদ আরিফ হোসেনের বাড়িতে হামলার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মুলাদী উপজেলার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে তার বাড়ির সামনে স্থাপিত লাঙ্গল প্রতীকের একটি নির্বাচনী প্রচারকেন্দ্র ভাঙচুর করা হয়। এ সময় আরিফ হোসেন বাড়িতে না থাকায় তাকে উদ্দেশ্য করে হুমকি দেওয়া হয়। ঘটনার প্রতিবাদ করলে বাড়ির কেয়ারটেকারকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। জাতীয় পার্টির ওই নেতা অভিযোগ করেন, স্থানীয় বিএনপি নেতা অপু মোল্লা ও শাওন হাওলাদারের নেতৃত্বে এ হামলা চালানো হয়েছে। লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী আলহাজ্ব গোলাম কিবরিয়া টিপুর প্রধান সমন্বয়ক ও তার কন্যা হাবিবা কিবরিয়া ফারিয়া বলেন, নির্বাচনের আগে নেতাকর্মীদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। এসব ঘটনায় সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে মুলাদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরাফাত জাহান চৌধুরী বলেন, ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নরসিংদী জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনের ৬৬৩টি ভোটকেন্দ্রে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ সামগ্রী ও ব্যালট পেপার পাঠানো হচ্ছে। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১০টা থেকে ছয়টি উপজেলার সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ভোটগ্রহণে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এসব সরঞ্জাম গ্রহণ করছেন। জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন জানান, ৬৬৩ কেন্দ্রের মধ্যে ৩৯৩টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫০টি কেন্দ্র অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরাসহ কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জেলার পাঁচটি পৌরসভা ও ৭১টি ইউনিয়নে মোট ভোটার সংখ্যা ১৯ লাখ ৭১ হাজার ২৩৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১০ লাখ ৩ হাজার ৪ জন, নারী ভোটার ৯ লাখ ৭০ হাজার ৯৮৭ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৩৬ জন। এসব আসনে মোট ৪১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা শাহেনশা আল-মামুন বলেন, দীর্ঘ সময় পর ভোটের পরিবেশ ফিরেছে। ভোটারদের মধ্যে আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তিনি জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়েছে এবং সন্ধ্যার মধ্যেই কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছানো হবে।
কুষ্টিয়া-২ সংসদীয় আসনের একটি ভোটকেন্দ্রে স্থাপিত নজরদারি ব্যবস্থায় চুরির ঘটনা ঘটেছে। মিরপুর পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত নওপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে দুটি সিসি ক্যামেরা সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকালে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি লক্ষ্য করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাকে অবহিত করে। পরবর্তীতে এ ঘটনায় মিরপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করা হয়। প্রশাসন ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সোমবার গভীর রাতে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে ভোটকেন্দ্রে স্থাপিত দুটি সিসি ক্যামেরা চুরি করে নিয়ে যায়। সকালে বিষয়টি ধরা পড়লে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো হয়। মিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নাজমুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বুধবার সকালে ওই কেন্দ্রে নতুন ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বলেন, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোজাম্মেল হক জিডি করেছেন। চুরি যাওয়া ক্যামেরা উদ্ধারে তদন্ত চলছে, তবে এখনো কাউকে আটক করা যায়নি। উল্লেখ্য, ভেড়ামারা ও মিরপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত কুষ্টিয়া-২ আসনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৭৮ হাজার ১ জন।