মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি চাঞ্চল্যকর বক্তব্যে দাবি করেছেন, ইরানের নেতৃত্ব তাকে দেশের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল, যা তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) ওয়াশিংটনে ন্যাশনাল রিপাবলিকান কংগ্রেসনাল কমিটির (এনআরসিসি) বার্ষিক তহবিল সংগ্রহ অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, ইরানী কর্মকর্তারা তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদটির জন্য প্রস্তাব দিয়েছিল, তবে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, “না ধন্যবাদ, আমি এটি চাই না।”
ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, তেহরান বর্তমানে মার্কিন ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ করতে গোপনে আলোচনায় তৎপর, যদিও প্রকাশ্যে তারা সব প্রস্তাব অস্বীকার করছে। তিনি বলেন, ইরানি কর্মকর্তারা চুক্তির জন্য আগ্রহী হলেও অভ্যুত্থান বা জনগণের ক্রোধের ভয়ে তা স্বীকার করতে পারছেন না।
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম ‘প্রেস টিভি’ জানিয়েছে, তেহরান যুদ্ধ বন্ধের জন্য নির্দিষ্ট শর্ত রেখেছে—ভবিষ্যতে আমেরিকা ও ইসরায়েল হামলা করবে না, ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ প্রদান, এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের পূর্ণ কর্তৃত্ব স্বীকৃতি। এই শর্তাবলী না মেনে ইরান যুদ্ধে পিছপা হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের দাবি মূলত ইরানের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি এবং অভ্যন্তরীণ বিভেদ উসকে দেওয়ার কৌশল। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধে উত্তেজনা এবং বিশ্ববাজারে তেলের অস্থিরতা ট্রাম্প ও তেহরানের কূটনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেও বাংলাদেশের জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ চলাচলের সম্ভাবনা উন্মুক্ত করেছে ইরান। তেহরান জানিয়েছে, বাংলাদেশসহ নির্বাচিত কিছু ‘বন্ধুপ্রতিম’ দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ব্যবহার করতে পারবে, যেখানে ইরানি সশস্ত্র বাহিনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জানান, হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়নি এবং নির্দিষ্ট দেশ ও জাহাজ মালিকদের জন্য নিয়মিত সমন্বয় চলছে। তিনি বলেন, চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান, ইরাক, ভারত এবং বাংলাদেশ এই বিশেষ সুবিধার আওতায় রয়েছে। ইতিমধ্যে ভারতের দুটি জাহাজ সফলভাবে প্রণালি পার হয়েছে, এবং বাংলাদেশের জন্যও সমন্বয় সম্পন্ন হয়েছে। তবে আরাঘচি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যেসব দেশকে ইরান শত্রু মনে করে বা যারা চলমান সংঘাতে সরাসরি জড়িত, তাদের কোনো জাহাজ এই পথ ব্যবহার করতে পারবে না। ইরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে প্রণালির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে, যার ফলে বিশ্ববাজারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি সরবরাহ কার্যত তেহরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বিশ্লেষণ ও শিপিং তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় ৯৫% কমে গেছে। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে ১২০টি জাহাজ চললেও চলতি মাসে মাত্র ১৫৫টি জাহাজ এই পথ অতিক্রম করেছে, প্রধানত তেল ও গ্যাসবাহী। এই বিশেষ ছাড় বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ চেইন সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে সক্ষম।
মার্কিন গণমাধ্যম ও গবেষণা সংস্থা রয়টার্স-ইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ইরান ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রভাব এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনসমর্থন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। জরিপে তার অনুমোদন হার মাত্র ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের জানুয়ারির দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর থেকে সবচেয়ে কম। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ আমেরিকানরা তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ওপর আস্থা হারাচ্ছেন। তার অর্থনৈতিক নীতি সমর্থন করছেন মাত্র ২৯ শতাংশ মানুষ। এছাড়া ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক পদক্ষেপ ও ইরান হামলার নীতিকে সমর্থন করছেন মাত্র ৩৫ শতাংশ নাগরিক। বিশ্লেষকরা মনে করেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংকটের এই পরিস্থিতি রিপাবলিকানদের জন্যও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। যদিও কট্টর সমর্থকদের মধ্যে ট্রাম্পের অবস্থান এখনও শক্তিশালী, তবে অসন্তুষ্টির হার সাম্প্রতিক সপ্তাহে ২৭ শতাংশ থেকে ৩৪ শতাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। জরিপ থেকে স্পষ্ট যে, মধ্যপ্রাচ্য ও অর্থনীতি সংক্রান্ত চলমান পরিস্থিতি মার্কিন নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রভাব ফেলছে এবং ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্ভাবনা এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে ১৫ দফা সমাধান প্রস্তাব পাঠিয়েছে। তবে শান্তি উদ্যোগের সঙ্গে সঙ্গেই ওয়াশিংটন অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে। খবর ‘ইউএসএ টুডে’-এর। সূত্র জানায়, পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের কাছে প্রেরিত ১৫ দফা প্রস্তাবে ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল ও পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিতকরণ এবং হরমুজ প্রণালী পুনঃউদ্বোধনের শর্ত অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। তবে এটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়নি। একই সময়ে পেন্টাগন জানিয়েছে, ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের অন্তত ১ হাজার থেকে ৩ হাজার প্যারাট্রুপার মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হচ্ছে। তারা ফোর্ট ব্র্যাগ থেকে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর প্রস্তুতিতে রয়েছে এবং বিদ্যমান নৌবাহিনী ও যুদ্ধজাহাজের সঙ্গে যুক্ত হবে। ওভাল অফিসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানি নেতাদের সঙ্গে ‘ফলপ্রসূ’ আলোচনা চলছে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে একটি ‘সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত’ সমাধান সম্ভব এবং ইরান ইতোমধ্যে তেল-গ্যাস নিয়ে বড় ধরনের ‘উপহার’ দিয়েছে। ইরান সরকার এই দাবিকে ‘ভুয়া খবর’ বলে অস্বীকার করেছে। উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পারমাণবিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ চালায়। পাল্টা হারে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়, যা বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওপর বিরাট প্রভাব ফেলেছে।