মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিউবাকে ঘিরে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি ইরান ও ভেনিজুয়েলায় মার্কিন সামরিক ব্যবহারের উদাহরণ টেনে বলেন, প্রয়োজনে কিউবাও পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে।
যদিও পরবর্তীতে তিনি মন্তব্যটি উপেক্ষা করার আহ্বান জানান।
এ মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে কিউবা সরকার সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি জোরদার করেছে। দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কার্লোস ফার্নান্দেজ ডি কসিও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আগ্রাসনের আশঙ্কায় সামরিক বাহিনীকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিউবার বর্তমান নেতৃত্বকে অকার্যকর আখ্যা দিয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি দেশটির চলমান জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক দুরবস্থাকে বর্তমান শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা হিসেবে তুলে ধরেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের বক্তব্য কৌশলগত চাপ সৃষ্টির অংশ হতে পারে, তবে অতীত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় এটিকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা সম্পর্ক নতুন করে অস্থিরতার মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহে তীব্র অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে তেহরান এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে কূটনৈতিক চাপ এবং অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই পদক্ষেপ বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস বাজারে দীর্ঘমেয়াদি মন্দার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের তেলের প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহের জন্য অপরিহার্য। ইরান পার্লামেন্টে আনুষ্ঠানিক আইন পাশ না হলেও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড ইতিমধ্যেই প্রণালিতে ‘টোল বুথ’ ব্যবস্থা চালু করেছে। চলাচলকারী জাহাজগুলোর নথি যাচাই ও ক্লিয়ারেন্সের মাধ্যমে অনুমোদিত রুট দেওয়া হচ্ছে, আর এ জন্য নির্দিষ্ট জাহাজ থেকে ফি নেওয়া হচ্ছে। তবে ভারতের মতো কিছু দেশকে নিরাপদ পারাপারের জন্য কোনো অর্থ দিতে হয়নি। আইন বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, জাতিসংঘের সমুদ্র আইন (ইউএনসিএলওএস) অনুযায়ী, বিদেশি জাহাজের ট্রানজিট প্যাসেজের অধিকার রক্ষিত। উপকূলীয় দেশের শান্তি বা নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত না হলে ফি আরোপ বৈধ নয়। হরমুজ প্রণালির সংকীর্ণ অংশ ২১ নটিক্যাল মাইল প্রশস্ত, যার মাত্র ১২ নটিক্যাল মাইলই ইরানের জলসীমা। সুতরাং আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে ইরানের ফি আরোপ সীমিত ও বিতর্কিত। বর্তমানে প্রায় ২ হাজার জাহাজ প্রণালির দু’পাশে আটকে আছে। এ পরিস্থিতি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ও যুদ্ধকালীন কৌশলকে সামনে রেখে হরমুজ প্রণালির এই নিয়ন্ত্রণ বৈশ্বিক সামুদ্রিক নীতি ও বাণিজ্যের জন্য নতুন অজানা ঝুঁকি তৈরি করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেও বাংলাদেশের জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ চলাচলের সম্ভাবনা উন্মুক্ত করেছে ইরান। তেহরান জানিয়েছে, বাংলাদেশসহ নির্বাচিত কিছু ‘বন্ধুপ্রতিম’ দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ব্যবহার করতে পারবে, যেখানে ইরানি সশস্ত্র বাহিনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জানান, হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়নি এবং নির্দিষ্ট দেশ ও জাহাজ মালিকদের জন্য নিয়মিত সমন্বয় চলছে। তিনি বলেন, চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান, ইরাক, ভারত এবং বাংলাদেশ এই বিশেষ সুবিধার আওতায় রয়েছে। ইতিমধ্যে ভারতের দুটি জাহাজ সফলভাবে প্রণালি পার হয়েছে, এবং বাংলাদেশের জন্যও সমন্বয় সম্পন্ন হয়েছে। তবে আরাঘচি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যেসব দেশকে ইরান শত্রু মনে করে বা যারা চলমান সংঘাতে সরাসরি জড়িত, তাদের কোনো জাহাজ এই পথ ব্যবহার করতে পারবে না। ইরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে প্রণালির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে, যার ফলে বিশ্ববাজারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি সরবরাহ কার্যত তেহরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বিশ্লেষণ ও শিপিং তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় ৯৫% কমে গেছে। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে ১২০টি জাহাজ চললেও চলতি মাসে মাত্র ১৫৫টি জাহাজ এই পথ অতিক্রম করেছে, প্রধানত তেল ও গ্যাসবাহী। এই বিশেষ ছাড় বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ চেইন সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে সক্ষম।
মার্কিন গণমাধ্যম ও গবেষণা সংস্থা রয়টার্স-ইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ইরান ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রভাব এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনসমর্থন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। জরিপে তার অনুমোদন হার মাত্র ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের জানুয়ারির দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর থেকে সবচেয়ে কম। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ আমেরিকানরা তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ওপর আস্থা হারাচ্ছেন। তার অর্থনৈতিক নীতি সমর্থন করছেন মাত্র ২৯ শতাংশ মানুষ। এছাড়া ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক পদক্ষেপ ও ইরান হামলার নীতিকে সমর্থন করছেন মাত্র ৩৫ শতাংশ নাগরিক। বিশ্লেষকরা মনে করেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংকটের এই পরিস্থিতি রিপাবলিকানদের জন্যও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। যদিও কট্টর সমর্থকদের মধ্যে ট্রাম্পের অবস্থান এখনও শক্তিশালী, তবে অসন্তুষ্টির হার সাম্প্রতিক সপ্তাহে ২৭ শতাংশ থেকে ৩৪ শতাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। জরিপ থেকে স্পষ্ট যে, মধ্যপ্রাচ্য ও অর্থনীতি সংক্রান্ত চলমান পরিস্থিতি মার্কিন নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রভাব ফেলছে এবং ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্ভাবনা এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে।