ওয়াশিংটনের সঙ্গে কথিত ‘ফলপ্রসূ সংলাপ’ প্রসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যকে সরাসরি অস্বীকার করেছে ইরান, একে ‘ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর দাবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে তেহরান। বুধবার (২৫ মার্চ) ভারতের সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়েই স্পষ্টভাবে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বর্তমানে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে না।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, অতীতে পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনায় অংশ নেওয়ার পরপরই ইরানের ওপর একাধিক সামরিক হামলা চালানো হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নীতিমালার পরিপন্থী এবং ‘বিশ্বাসভঙ্গের শামিল’। তার ভাষায়, “কূটনীতির আড়ালে আগ্রাসন চালানো হয়েছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়।”
এদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে ইতিবাচক অগ্রগতির দাবি করলেও তেহরান জানায়, পাকিস্তানসহ কয়েকটি বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের মাধ্যমে প্রস্তাব এলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। বরং এসব বক্তব্যকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার প্রভাবিত করার কৌশলগত প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে ইরান।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুনরায় অবস্থান স্পষ্ট করে বলেছেন, চলমান সামরিক হামলা বন্ধ, ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো ধরনের সমঝোতা বা চুক্তির প্রশ্নই ওঠে না।
বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে সীমিত বার্তা আদান-প্রদান চললেও বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরান প্রকাশ্যে কোনো নমনীয় অবস্থান নিতে অনাগ্রহী। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সংঘাত, প্রাণহানি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে তেহরান সম্ভাব্য কোনো চুক্তিকে কৌশলগত ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করছে।
পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রেরিত যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব ইরানের হাতে পৌঁছেছে বলে নিশ্চিত করেছেন কূটনৈতিক সূত্র। আলজাজিরার প্রতিবেদক ওসামা বিন জাভেদ জানিয়েছেন, পাকিস্তানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রস্তাবটি ইরানিদের কাছে উপস্থাপন করেছেন এবং এখন ইরানের জবাবের প্রতীক্ষা চলছে। একই সূত্র জানায়, আগামী দিনগুলোতে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে তুরস্কের ক্ষমতাসীন একে পার্টির পররাষ্ট্র বিষয়ক সহসভাপতি হারুন আরমাগান রয়টার্সকে বলেন, আঙ্কারা তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ‘বার্তা আদান-প্রদানের ভূমিকা’ পালন করছে। তিনি জানান, এই মধ্যস্থতা উত্তেজনা প্রশমিত করা এবং সরাসরি আলোচনার পথ সুগম করার উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে।
ইরানের তেহরান সরকার মধ্যপ্রাচ্যের চলমান মাসব্যাপী রণক্ষেত্রীয় সংঘাতের অবসানের জন্য এবার কৌশলগতভাবে পাঁচটি কঠোর শর্ত উত্থাপন করেছে। সোমবার (২৩ মার্চ) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টি চূড়ান্ত করতে চাইছে, তবে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ ছাড়া কোনো আলোচনায় অংশ নেবে না। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরানের দাবিসমূহের মধ্যে রয়েছে— ১. স্থায়ী যুদ্ধবিরতি: সাময়িক নয়, সম্পূর্ণভাবে পুনরায় যুদ্ধ শুরু হবে না তার আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা। ২. হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ: কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথে কার্যত ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। ৩. মার্কিন সামরিক ঘাঁটি প্রত্যাহার: মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে স্থাপিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করার দাবি। ৪. আর্থিক ক্ষতিপূরণ: যুদ্ধের কারণে ইরানের অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি পূরণের জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ। ৫. সংবাদমাধ্যম ও শত্রুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: বিরোধী অপপ্রচারে লিপ্ত মিডিয়া ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থা, প্রয়োজন হলে শত্রুদের হস্তান্তর। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের সঙ্গে নিবিড় আলোচনায় রয়েছেন। তবে ইরানের পাঁচ শর্ত কতটা বাস্তবায়নযোগ্য হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে সংশয় তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি এখন এই শর্তগুলোর সঙ্গে রণক্ষেত্রের বাস্তবতার সংমিশ্রণে দুলছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বর্তমানে চলমান যুদ্ধের বহুমুখী চাপ এবং এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবেলা করতে কষ্ট হচ্ছে, এমনই মন্তব্য করেছেন হোয়াইট হাউস কলামিস্ট নিয়াল স্ট্যানেজ। দ্য হিলের বিশেষজ্ঞের মতে, বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও জনগণের ক্রোধ ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। স্ট্যানেজ আল জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্প এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে ‘এক্সিট র্যাম্প’ বা নিরাপদ প্রস্থানের পথ খুঁজছেন। তিনি আরও ইঙ্গিত দেন, হোয়াইট হাউসের সাম্প্রতিক বিবৃতিগুলো হতে পারে কৌশলগত ধাপ্পাবাজি বা খুব শীঘ্রই নীতিগত পরিবর্তনের প্রস্তুতি। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন ভোট-রাজনীতি ও অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে সামরিক কৌশলগত অবস্থান সমন্বয় ঘটানো—এই দ্বিমুখী চাপে ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ বিশ্ব রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে।