আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। আলাদা ব্যালটে ভোটাররা চারটি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের ভিত্তিতে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেবেন।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে আগামী সংসদ বাধ্য থাকবে। এর মধ্যে ৪৭টি সাংবিধানিক এবং ৩৭টি আইন, বিধি বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কার্যকর করার প্রস্তাব রয়েছে। আর ‘না’ জয়ী হলে জুলাই সনদ কার্যকর হবে না।
অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমে নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকলেও পরে সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা শুরু করে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এক ভিডিও বার্তায় ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
ভাষা, জাতীয় পরিচয় ও মৌলিক নীতি
জুলাই সনদ অনুযায়ী বাংলা রাষ্ট্রভাষা থাকলেও অন্যান্য মাতৃভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হবে। নাগরিকদের পরিচয় হবে ‘বাংলাদেশি’। সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে যুক্ত হবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি।
মৌলিক অধিকারের তালিকায় যুক্ত হবে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট এবং ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার অধিকার।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা
জরুরি অবস্থা জারিতে মন্ত্রিসভার অনুমোদন বাধ্যতামূলক হবে এবং মৌলিক অধিকার স্থগিত করা যাবে না। রাষ্ট্রপতি গোপন ব্যালটে নির্বাচিত হবেন এবং একাধিক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই ভূমিকা রাখতে পারবেন।
এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ বা ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।
সংসদ ও নির্বাচন ব্যবস্থা
সংসদ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করার প্রস্তাব রয়েছে। উচ্চকক্ষে ১০০ সদস্য থাকবেন, যারা দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে নির্বাচিত হবেন। নারীদের সংরক্ষিত আসন বাড়িয়ে ১০০ করার প্রস্তাবও রয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল এবং নির্বাচন কমিশন গঠনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
আইন ও বিচার বিভাগ
প্রধান বিচারপতি আপিল বিভাগ থেকে নিয়োগের বিধান, বিচার বিভাগকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া এবং ন্যায়পালসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে বহুপক্ষীয় কমিটির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সাংবিধানিক ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে নতুন বিধান যুক্ত করার প্রস্তাবও রয়েছে।
গণভোটের ব্যালটে এসব বিস্তারিত বিষয় উল্লেখ থাকবে না। সেখানে কেবল চারটি সংক্ষিপ্ত বিষয়ের ভিত্তিতে ভোট গ্রহণ করা হবে। তবে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে এসব সংস্কার বাস্তবায়ন আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক হবে।
সরকার র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও বিশেষ শাখা (এসবি) পরিচালনার জন্য নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ করেছে। সোমবার (১৬ মার্চ) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারি হওয়া আদেশ অনুযায়ী, র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে অতিরিক্ত আইজিপি আহসান হাবিব পলাশকে, যিনি আগে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি পদে নিযুক্ত ছিলেন। একই আদেশে অতিরিক্ত আইজিপি সরদার নূরুল আমিনকে এসবির প্রধান, অতিরিক্ত আইজিপি মোসলেহ উদ্দিনকে সিআইডির প্রধান এবং অতিরিক্ত আইজিপি ছিবগাত উল্লাহকে পুলিশ সদর দফতরের দায়িত্বে রাখা হয়েছে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার পদে অতিরিক্ত আইজিপি শওকত আলী এবং এপিবিএন প্রধান হিসেবে অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, এসবির ডিআইজি মনিরুজ্জামানকে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে বদলি করা হয়েছে। পদায়নের এই রদবদল আইনশৃঙ্খলা সংস্থাগুলোর কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও সমন্বিত করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার প্রশাসনিক কার্যক্রমকে গতিশীল ও কার্যকর করার লক্ষ্যে দেশের ৪২টি জেলা পরিষদে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। রোববার (১৫ মার্চ) এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জেলা পরিষদগুলোর প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে আরও সমন্বিত ও ত্বরান্বিত করার উদ্দেশ্যে এ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসকরা দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে জেলা পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা ও তদারকিতে ভূমিকা রাখবেন বলে আশা করা হচ্ছে। নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকদের মধ্যে রয়েছেন— পঞ্চগড়ে মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, দিনাজপুরে মোফাজ্জল হোসেন দুলাল, রংপুরে মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, কুড়িগ্রামে মো. সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ, গাইবান্ধায় অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক, জয়পুরহাটে মো. মাসুদ রানা প্রধান, বগুড়ায় এ. কে. এম. আহাসানুল তৈয়ব জাকির, চাঁপাইনবাবগঞ্জে মো. হারুনুর রশিদ, নওগাঁয় মো. আবু বক্কর সিদ্দিক, রাজশাহীতে মো. এরশাদ আলী এবং নাটোরে মো. রহিম নেওয়াজ। এ ছাড়া মেহেরপুরে মো. জাভেদ মাসুদ, কুষ্টিয়ায় সোহরাব উদ্দিন, ঝিনাইদহে মো. আবুল মজিদ, যশোরে দেলোয়ার হোসেন খান খোকন, মাগুরায় আলী আহমেদ, বাগেরহাটে শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন, খুলনায় এস. এম. মনিরুল হাসান (বাপ্পী), পটুয়াখালীতে স্নেহাংশু সরকার, ভোলায় গোলাম নবী আলমগীর, বরিশালে আকন কুদ্দুসর রহমান, ঝালকাঠিতে মো. শাহাদাৎ হোসেন, পিরোজপুরে আলমগীর হোসেন, টাঙ্গাইলে এস. এম. ওবায়দুল হক এবং শেরপুরে এ. বি. এম. মামুনুর রশিদনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও ময়মনসিংহে সৈয়দ এমরান সালেহ, নেত্রকোনায় মো. নূরুজ্জামান (এড.), কিশোরগঞ্জে খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল খান, মুন্সীগঞ্জে এ. কে. এম. ইরাদত, নারায়ণগঞ্জে মো. মামুন মাহমুদ, রাজবাড়ীতে আব্দুস সালাম মিয়া, গোপালগঞ্জে শরিফ রফিক উজ্জামান, মাদারীপুরে খোন্দকার মাশুকুর রহমান, শরীয়তপুরে সরদার এ. কে. এম. নাসির উদ্দিন, সুনামগঞ্জে মো. মিজানুর রহমান চৌধুরী, সিলেটে আবুল কাহের চৌধুরী, মৌলভীবাজারে মিজানুর রহমান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সিরাজুল ইসলাম, কুমিল্লায় মো. মোশতাক মিয়া, নোয়াখালীতে মো. হারুনুর রশিদ আজাদ, লক্ষ্মীপুরে সাহাব উদ্দিন এবং কক্সবাজারে এ টি এম নুরুল বশর চৌধুরীকে জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সরকার মনে করছে, নতুন এই নিয়োগের ফলে স্থানীয় সরকার কাঠামোর কার্যক্রমে গতি আসবে এবং জেলা পর্যায়ের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন আরও কার্যকরভাবে পরিচালিত হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট করেছেন, সংবিধান অনুসারে ‘সংস্কার পরিষদ’-এর কোনো বৈধ অস্তিত্ব নেই। তিনি বলেন, “রাষ্ট্রপতি সংসদের অধিবেশন ডেকেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ নয়। এই বিষয় এখনও উচ্চ আদালতে বিচারাধীন। সংবিধান অনুসারে কোনও সংস্কার পরিষদের নিয়ম বা কাঠামো নেই। যদি ভবিষ্যতে গণভোট বা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এটি অনুমোদিত হয়, তা হলে সংবিধানে সংশোধন করে নির্দিষ্ট ফর্ম ও শপথের বিষয় নির্ধারণ করা যাবে।” সালাহউদ্দিন বলেন, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদত্যাগ করেছেন যাতে অধিবেশনে নিরপেক্ষতা বজায় থাকে। তিনি আরও যোগ করেন, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বৈধতার পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তীতে সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।