রাজধানীতে দিনে-দুপুরে ছিনতাই: নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
রাজধানী ঢাকায় দিনে-দুপুরে ছিনতাইয়ের ঘটনা ক্রমশ বেড়ে চলেছে। সাধারণ মানুষ বাড়ি থেকে অফিস বা বাজার করার জন্য বের হলেও নিরাপত্তাহীনতার কারণে তারা অনেক সময় উদ্বিগ্ন থাকেন। এমন পরিস্থিতিতে শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, বিশেষ করে পুলিশের কার্যক্রম ও আইনের শাসনের প্রভাব কতটা রয়েছে তা নিয়ে।
দুপুরের সময় হলেও পথচারী, যাত্রী ও গাড়ি চালকরা ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন। মোবাইল ফোন, ব্যাগ, অর্থসহ অন্যান্য মূল্যবান জিনিস ছিনতাইকারীদের লক্ষ্যবস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ধরনের ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত সম্পদের ক্ষতি নয়, বরং মানুষের মানসিক নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দিনের আলোতে এমন অপরাধ বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে নানা কারণ কাজ করছে। যেমন, বাড়ছে বেকারত্ব, দারিদ্র্য, সামাজিক মূল্যবোধের অবনতি এবং অপরাধীদের মধ্যে ভয়ঙ্কর অস্ত্র বহন। এছাড়া সড়ক পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকাও বড় কারণ।
সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সময়-সময়ে নানা উদ্যোগ নিয়েছে নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য। বিশেষ অভিযান, সিসি ক্যামেরা স্থাপন, পেট্রোলিং বাড়ানো ইত্যাদি চেষ্টা হলেও তাতে অনেক ক্ষেত্রেই কাঙ্খিত ফল পাওয়া যায়নি। অনেক এলাকায় অপরাধীরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিচ্ছে।
নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়ে যাওয়ায় তারা নিজেও সতর্ক হয়ে উঠছেন। ভিড়বহুল এলাকায় বেশি সতর্ক থাকা, বিকল্প পথ ব্যবহার করা, রাতের সময়ে অযথা বাইরে না যাওয়ার মতো অভ্যাস গড়ে উঠেছে। কিন্তু এসব ব্যক্তিগত ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়।
নাগরিক ও প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক সংহতি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। স্থানীয় কমিউনিটি পুলিশিং, সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে অপরাধ কমানো সম্ভব। এছাড়া দ্রুত অপরাধী সনাক্ত ও গ্রেফতারে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সব মিলিয়ে, দিনে-দুপুরে ছিনতাইয়ের ঘটনায় আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট হচ্ছে। দেশের রাজধানী হিসেবে ঢাকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ দরকার।
নিরাপত্তা হল এক ধরনের মৌলিক অধিকার, যা প্রত্যেক নাগরিকের থাকা উচিত। তাই সময় নেয়া প্রয়োজন আধুনিক ও কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার, যাতে সবাই নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে।
ঢাকার কেরানীগঞ্জের রাস্তায় কর্মস্থলগামী এক কারারক্ষী ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন। ভুক্তভোগী সাথী আক্তার (৩০) বুধবার (৭ জানুয়ারি) সকাল সোয়া ৬টার দিকে মুজাহিদনগর আন্ডারপাসে অজ্ঞাতনামা ৩-৪ ছিনতাইকারীর হাতে দেশীয় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তার স্বর্ণের চেইন, এক জোড়া কানের দুল, মোবাইল ফোন এবং পাঁচ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। তিনি চিৎকার করলে ছিনতাইকারীরা পালিয়ে যায়। ভুক্তভোগী কারাগারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরামর্শে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। থানার ওসি সাইফুল ইসলাম জানান, ঘটনার তদন্ত চলছে এবং দ্রুত দোষীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।
দেশজুড়ে অনলাইনে প্রশ্নপত্র ফাঁসের একটি সংঘবদ্ধ চক্র ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছে পুলিশের সাইবার ইউনিট। বিশেষ করে চাকরি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাকে ঘিরে এই চক্র নতুন কৌশলে প্রতারণা চালাচ্ছে। সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে এই চক্রের ৫ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের ডিজিটাল অপরাধ দমন শাখা (Cyber Crime Investigation Division)। পুলিশ জানায়, অভিযুক্তরা মোবাইল অ্যাপ, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম (যেমন: টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ) এবং ফেসবুক পেইজের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজব ছড়িয়ে প্রার্থীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছিল। সাইবার ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার তানভীর হাসান বলেন, “এই চক্র প্রযুক্তির অপব্যবহার করে পরীক্ষার্থীদের মিথ্যা আশ্বাস দিচ্ছিল। তাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও প্রতারণা আইনে মামলা হয়েছে।” ‘গ্যারান্টি’ দিয়ে বিক্রি হতো ভুয়া প্রশ্নপত্র প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, চক্রটি মূলত দুটি ধাপে কাজ করত—প্রথমে তারা ফেসবুকে ‘ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন’ বা ‘সরকারি চাকরি প্রশ্ন ফাঁস’ নামে কিছু গ্রুপ চালু করত। সেসব গ্রুপে বিজ্ঞাপন দিয়ে দাবি করত, পরীক্ষার আগেই তারা “আসল প্রশ্নপত্র” দিতে পারবে। দ্বিতীয় ধাপে, আগ্রহী প্রার্থীদের সঙ্গে গোপন চ্যাটে কথা বলে বিকাশ/নগদে টাকা সংগ্রহ করত। অনেক সময় তারা আগের বছরের প্রশ্ন বা সাজানো প্রশ্ন ‘নমুনা’ হিসেবে পাঠিয়ে বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করত। পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে বেশ কিছু ফেক অ্যাকাউন্টের তথ্য, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও সিমকার্ড জব্দ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. মাহবুবা হোসেন বলেন, “ভয়াবহ বিষয় হলো—তরুণ প্রজন্ম এখন অনলাইন প্রতারণাকে সহজলভ্য করে দেখছে। প্রশ্ন ফাঁসের গুজবের পেছনে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপও বড় কারণ।” আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হুঁশিয়ারি ও পরামর্শ পুলিশ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক অভিযানে ধরা পড়া ব্যক্তিরা অন্তত তিনটি বড় পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে শতাধিক পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আদায় করেছে। শুধু গত দুই মাসেই তারা প্রায় ১৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে দাবি পুলিশের। ডিজিটাল অপরাধ দমন শাখা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের নামে কোনো ধরনের লেনদেনে জড়ানো সম্পূর্ণ বেআইনি। এমন প্রতারণার শিকার হলে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের সাইবার হেল্পলাইনে (৯৯৯ বা সাইবার পোর্টাল) জানাতে বলা হয়েছে। তাদের মতে, এই ধরনের চক্রকে প্রতিরোধ করতে হলে অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। অনেক সময় পরীক্ষার্থীরা মানসিক চাপে পড়ে শর্টকাট খুঁজতে গিয়ে প্রতারণার ফাঁদে পড়ে যায়। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড ইতোমধ্যে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, “প্রশ্নপত্র ফাঁস বলে কোনো ব্যবস্থা বা সংযোগ বাস্তবে নেই। কেউ এ ধরনের গুজবে কান দেবেন না। বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করুন।” পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চক্রটি আরও বড় পরিসরে বিস্তার লাভ করছিল। গ্রেপ্তারকৃতদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন জেলায় সক্রিয় আরও কিছু সদস্যের খোঁজ চলছে। তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চাকরির প্রতারণার ফাঁদে শতাধিক যুবক-যুবতী বর্তমানে চাকরি পাওয়া যেমন কঠিন হয়ে উঠেছে, তেমনি বেড়েছে ভুয়া চাকরির প্রতারণা। সাম্প্রতিক এক ঘটনায় দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শতাধিক যুবক-যুবতী এক ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ে হয়েছেন প্রতারিত। চাকরির আশায় তারা টাকা দিয়েও এখন কাজের মুখ দেখেননি। বরং হারিয়েছেন সময়, অর্থ ও আত্মবিশ্বাস। ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানী ঢাকায়। একটি কথিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে ফেসবুক ও বিভিন্ন চাকরির ওয়েবসাইটে আকর্ষণীয় চাকরির বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। বলা হয়—“বিনা অভিজ্ঞতায় ২০,০০০ টাকা বেতনে কর্পোরেট অফিসে চাকরি, শুধু ইন্টারভিউ দিলেই হবে।” এই বিজ্ঞাপনের প্রলোভনে অনেক তরুণ-তরুণী আবেদন করেন। পরে ফোনে ডেকে আনা হয় অফিসে, নেওয়া হয় ৫০০–২০০০ টাকা “প্রসেসিং ফি” নামে। ইন্টারভিউ নেওয়ার নামে দীর্ঘ সময় বসিয়ে রাখা হয়, কথিত প্রশিক্ষণের নামে আরও টাকা চাওয়া হয়। কেউ কেউ মাসখানেক কাজ করেও বেতন পাননি। অবশেষে প্রতিষ্ঠানটির অফিস হঠাৎ করেই বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফোন নম্বরগুলো বন্ধ, আর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পলাতক। এই ধরনের ঘটনা দেশে নতুন নয়। প্রতিনিয়ত চাকরির নামে এ ধরনের প্রতারণা বেড়েই চলেছে। সবচেয়ে বিপদে পড়ছেন সদ্য গ্র্যাজুয়েট তরুণ-তরুণীরা, যাদের হাতে অভিজ্ঞতা নেই, আর স্বপ্ন রয়েছে অনেক।