প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে বাংলাদেশী জনগণ সংবিধান সংস্কারের পক্ষে স্পষ্টভাবেই ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। তিনি বলেন, ভোটের ফলাফল দেখাচ্ছে যে দেশের নাগরিকরা পরিবর্তনের পক্ষে, আর তারা পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে যেতে চান না।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, মোট ৭ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ২৩ জন ভোটার গণভোটে অংশ নিয়েছেন, যা মোট ভোটারের প্রায় ৬০.৮৪ শতাংশ। এর মধ্যে ৪ কোটি ৮২ লাখ ৬৬ হাজার ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন, যা মোট কাস্টকৃত ভোটের ৬৮.০৬ শতাংশ। ‘না’ ভোট পেয়েছে ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬ ভোটার, যা ৩১ শতাংশের কাছাকাছি। উল্লেখযোগ্য, ভোটারদের অংশগ্রহণের হার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চেয়ে এক শতাংশ বেশি।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ আরও বলেন, গণভোটের ফলাফল কেবল সংখ্যার বিষয় নয়, এটি দেশের জনগণের প্রত্যাশা এবং ২০২৪ সালের আগস্টের গণ–অভ্যুত্থানে জীবন বাজি রাখার সাহসী প্রেরণার প্রতি সম্মান ও দায়িত্বের স্বীকৃতি।
গণভোটের ফলাফল রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংস্কারের পথে জনগণের রায়কে ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব (চুক্তিভিত্তিক) এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া-কে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের (চুক্তিভিত্তিক) অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এর আগে একই দিনে পৃথক প্রজ্ঞাপনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশীদ-এর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করে সরকার। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া ১৯৮২ বিসিএসের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। ২০০৯ সালে যুগ্ম সচিব থাকা অবস্থায় তিনি ওএসডি হন এবং ২০১৬ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ‘সিরাজ উদ্দিন সাথী’ নামে পরিচিত এই কর্মকর্তা আমলাতন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধ, সমাজ বিবর্তন, ধর্মচিন্তা ও অর্থনীতি বিষয়ে ৩২টি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার প্রথম গ্রন্থ বেলতৈল গ্রামের জরিমন ও অন্যান্য সম্পাদনা করেন বর্তমান প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। আমলাতন্ত্র বিষয়ক তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র এবং আমলাতন্ত্রের অন্দরমহলে বত্রিশ বছর।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের কাছে দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীন শপথ অনুষ্ঠানের দায়িত্ব নিতে পারেন, যা আগামী সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) বা মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) আয়োজনের সম্ভাবনা রয়েছে। একই দিনে নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদেরও শপথ নেওয়া হতে পারে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় জানায়, নির্বাচনের গেজেট প্রকাশের পর আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে তিন থেকে চার দিন সময় লাগতে পারে। সংবিধান অনুযায়ী বিদায়ী স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াতে পারেন। তবে তাঁর পদত্যাগের পর শপথ অনুষ্ঠানের দায়িত্ব অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু হত্যা মামলায় কারাগারে থাকায় বিকল্প সাংবিধানিক প্রক্রিয়াও জটিল। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শপথ অনুষ্ঠানের বিষয়টি শুধু প্রক্রিয়াগত নয়, এবারের নির্বাচনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধান অনুচ্ছেদ ১২৩(৩) অনুযায়ী সংসদ ভেঙে যাওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও, এবারের নির্বাচন সেই কাঠামোর বাইরে অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজনৈতিক ঐকমত্যে শপথ অনুষ্ঠানের সময়সূচি পরিবর্তন সম্ভব, যা দলগুলোর সম্মতিতে তিন দিনের অপেক্ষা ছাড়াই আয়োজন করা যেতে পারে। তফসিল অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ–অভ্যুত্থানের পর সরকার পতনের পর ৬ আগস্ট সংসদ ভেঙে যায়। ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় এবং ২৯৭টির বেসরকারি ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। দুই আসনের গেজেট উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় স্থগিত। ফলাফল অনুযায়ী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ২০৯ আসনে জয়ী এবং তাদের মিত্ররা পেয়েছে আরও ৩টি আসন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৬৮ আসন ও তাদের জোটের শরিকরা ৯টি আসনে জয়লাভ করেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ‘গণভোট ২০২৬’ নির্বিঘ্নভাবে আয়োজনের লক্ষ্যে নির্বাচনকালীন সমন্বয় ও অভিযোগ ব্যবস্থাপনায় বিশেষ কন্ট্রোল রুম চালু করেছে সরকার। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-১ শাখা থেকে জারি করা এক অফিস আদেশে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, মন্ত্রণালয়ের ১ নম্বর ভবনের ১৮০২ নম্বর কক্ষে স্থাপিত এই কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে মাঠ প্রশাসন থেকে আসা নির্বাচনসংক্রান্ত অভিযোগ ও তথ্য যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ জন্য একটি হটলাইন নম্বর (+৮৮০২২২৬৬৪১১১৮) চালু করা হয়েছে। ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দুই শিফটে কন্ট্রোল রুমের কার্যক্রম পরিচালিত হবে। সার্বিক তদারকির দায়িত্বে থাকবেন প্রতিদিন একজন করে যুগ্মসচিব। প্রতিটি শিফটে উপসচিব বা সিনিয়র সহকারী সচিবের নেতৃত্বে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সহায়ক কর্মীরা দায়িত্ব পালন করবেন। অফিস আদেশে বলা হয়েছে, কন্ট্রোল রুমে প্রাপ্ত অভিযোগের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় বজায় রেখে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।