মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করার বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে কঠোর সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
শনিবার (২১ মার্চ) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় জানান, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রণালীটি উন্মুক্ত না করা হলে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো, বিশেষত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রসমূহকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হতে পারে। এই ঘোষণাকে আন্তর্জাতিক আইন ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানও পাল্টা কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। দেশটির সামরিক সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কোনো ধরনের অবকাঠামোগত হামলা হলে তাৎক্ষণিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জ্বালানি ও কৌশলগত স্থাপনাগুলোর ওপর পাল্টা আঘাত হানা হবে।
এদিকে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় বহু হতাহতের খবর পাওয়া গেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পাল্টাপাল্টি হুমকি কেবল আঞ্চলিক সংঘাতকেই তীব্রতর করছে না, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করলেও সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে।
ইরান জানিয়েছে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী এখনো আন্তর্জাতিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত থাকবে, তবে সব নৌযানকে চলার আগে তেহরান সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও)-র সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাজ্যে ইরানের রাষ্ট্রদূত আলী মুসাভি এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইরান সামুদ্রিক নিরাপত্তা উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এবং দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত, তবে প্রণালী শুধুমাত্র তাদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত রাষ্ট্রের জন্য বন্ধ থাকবে। মুসাভি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উত্তেজনামূলক কার্যকলাপকে এই অঞ্চলের নৌ-চলাচলের ঝুঁকির মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের শর্তসাপেক্ষ অনুমতি আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ কমানোর কৌশল। বিকল্প নিরাপদ নৌপথের অভাবে হরমুজ প্রণালী সচল থাকা বিশ্ব তেলের বাজারের জন্য অত্যন্ত জরুরি। তবে শর্ত মেনে পশ্চিমা দেশগুলো তাদের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত। হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এবং সমন্বয় প্রক্রিয়া এখন বিশ্বজ্বালানি নিরাপত্তার মূল ফোকাসে পরিণত হয়েছে।
ইরানের আধাসামরিক বাহিনী রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) মুখপাত্র শুক্রবার (২০ মার্চ) জানিয়েছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দাবি যে তেহরান এখন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে অক্ষম, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। জেনারেল আলী মোহাম্মদ নায়েইনি ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইরান’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানান, দেশটি নিয়মিতভাবে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি এবং মজুদ বাড়াচ্ছে। তিনি আরও বলেন, “যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতেও ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পে কোনো ধরণের সমস্যা সম্মুখীন হচ্ছে না। আমাদের উৎপাদন এখনো উচ্চমানের এবং ধারাবাহিক।” জেনারেল নায়েইনি ইরানের শিক্ষাব্যবস্থার নিখুঁত ফলাফল এবং ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পের উন্নত সক্ষমতার মধ্যে তুলনা টানেন। তদন্তকারীরা মনে করছেন, এই বিবৃতির মাধ্যমে তেহরান ইসরায়েল ও তার মিত্র দেশগুলোকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, যুদ্ধ এবং সামরিক প্রস্তুতি চলমান থাকবে যতক্ষণ না ইরানের নিরাপত্তা ও প্রভাব নিশ্চিতভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে।
ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের গোয়েন্দা প্রধানকে লক্ষ্য করা হয়েছে, তবে তার প্রাণহানির তথ্য নিশ্চিত হয়নি। কাতারের আল জাজিরা জানিয়েছে, এই অভিযান ইসরায়েলের পক্ষ থেকে পরিচালিত হলেও আঘাতের পরিমাণ ও ফলাফল এখনো যাচাই চলছে। ইরান থেকে পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে তেল আবিব ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে, এতে অন্তত দুজন নিহত এবং অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশেষত রামাত গানে একটি রকেট সরাসরি বসবাসস্থানে আঘাত হানে, যেখানে ৭০ বছরের একটি দম্পতির মৃত্যু হয়। হামলায় তেল আবিবের একটি রেলস্টেশনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, নিরাপত্তার কারণে ট্রেন চলাচল সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও হিজবুল্লাহর অন্তত শতাধিক রকেট ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। সংঘাতের এই জটিল পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।