মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার জেরে ইরান ও মার্কিন-মিত্র বাহিনীর মধ্যে সামরিক সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। সোমবার (২৩ মার্চ) ইরানি রাজধানী তেহরান ও দেশটির বিভিন্ন প্রদেশে ব্যাপক বিস্ফোরণ এবং আঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এর সঙ্গে মিলিয়ে ইসরায়েলও তেহরানের অবকাঠামো লক্ষ্য করে ‘বিস্তৃত হামলা’ চালিয়েছে।
স্থানীয় সূত্র এবং আল-জাজিরার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, তেহরান, খোররামাবাদ, তাবরিজ, বান্দার আব্বাস, ইসফাহান, কারাজ ও আহভাজসহ শহরগুলোতে বিস্ফোরণ এবং ক্ষতি ঘটেছে। আহভাজে একটি হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, ৮০ হাজারেরও বেশি বেসামরিক অবকাঠামো প্রভাবিত হয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের মতে, তাবরিজ ও খোররামাবাদে অন্তত ১০ জন নিহত এবং বহু আহত হয়েছেন।
একই সময়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ইসরায়েলের মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলে ধ্বংসাবশেষ ফেলে, উত্তরে সাইরেন বাজানো হয়েছে। হিজবুল্লাহর সম্পৃক্ততার আশঙ্কাও করা হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী খোলার সময়সীমা বাড়িয়ে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে আইআরজিসি হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যদি যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্ররা হামলা চালায়, ইরান আঞ্চলিক জ্বালানি ও শিল্প অবকাঠামো লক্ষ্য করবে এবং সমুদ্রপথে মাইন স্থাপন করে গুরুত্বপূর্ণ রুট বন্ধ করতে পারে।
যুদ্ধকেন্দ্রিত এই সংঘাতের ফলে মৃতের সংখ্যা ইরানে ১,৫০০ ছাড়িয়ে গেছে, আর ইসরায়েলে অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অস্থির অবস্থায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান ফাতিহ বিরোল সতর্ক করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি ১৯৭০-এর দশকের জ্বালানি সংকটের চেয়ে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
একই সময়ে আবুধাবি, বাহরাইন ও কুয়েতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সৌদি বাহিনী রিয়াদগামী ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত এবং পূর্বাঞ্চলে ড্রোন ধ্বংস করেছে।
সংক্ষিপ্তভাবে, মধ্যপ্রাচ্য এখন এক বিস্তৃত যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে সামরিক অভিযান, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ একযোগে সংঘটিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চলমান অস্থিরতা ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট ও ২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবকে মিলিয়ে আরও ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছেন আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)-র নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরল। সোমবার (২৩ মার্চ) অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায় ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে এক মিডিয়া ইভেন্টে তিনি এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বিরল বলেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকার পাশাপাশি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ৯টি দেশের ৪০টি তেল ও গ্যাস স্থাপনায় হামলার কারণে দৈনিক তেলের সরবরাহ প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল হ্রাস পেয়েছে, যা সত্তরের দশকের সংকটের তুলনায় দ্বিগুণ। একই সঙ্গে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহও প্রায় ১৪০ বিলিয়ন ঘনমিটার কমেছে। আইইএ প্রধান আরও বলেন, পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক “বৃহৎ হুমকি” এবং এই সংকটের মাত্রা অনেকের কাছে সঠিকভাবে বোঝা যায়নি। তাই সংস্থাটি প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেছে। সংস্থাটি ইতোমধ্যে জরুরি মজুদ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়ের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে এবং দূরবর্তী কাজ, কারপুলিং বৃদ্ধি ও যানবাহনের গতিসীমা কমানোর মতো সাশ্রয়ী পদক্ষেপের সুপারিশ দিয়েছে। তবুও বিরলের মতে, সংকটের একমাত্র কার্যকর সমাধান হলো হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলা, কারণ এটি বিশ্বের মোট তেল ও এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করে। এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছেন, আর ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, হামলা হলে হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেবে। বর্তমানে এই স্ট্র্যাটেজিক জলপথে কেবল নির্দিষ্ট কিছু দেশের জাহাজই চলাচল করছে, যা আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ফেলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর পরিকল্পিত সামরিক অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তেহরানের সঙ্গে চলমান ‘গঠনমূলক’ কূটনৈতিক সংলাপের ধারাবাহিকতায় পাঁচ দিনের জন্য এ স্থগিতাদেশ কার্যকর করা হয়েছে। সোমবার (২৩ মার্চ) দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, এই বিরতি চলমান সংঘাতে উত্তেজনা প্রশমনের একটি সম্ভাব্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত থাকায় আলোচনার ক্ষেত্র সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে সংঘাত তীব্রতর হওয়ায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ও বাজার স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে এই সাময়িক স্থগিতাদেশ কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
পাকিস্তান যদি বিদেশি আগ্রাসনের শিকার হয়, তবে ভারতের মেগাসিটি মুম্বাই ও দিল্লিকে সরাসরি আঘাত করার কোনো দ্বিধা থাকবে না—এই দাবি করেছেন ভারতে নিযুক্ত সাবেক পাকিস্তানি হাইকমিশনার আব্দুল বাসিত। সোমবার (২৩ মার্চ) পাকিস্তানের এবিএন নিউজ টিভির ‘ডিসাইফার’ অনুষ্ঠানে তিনি এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। বাসিত বলেন, “যদি যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানে সামরিক অভিযান চালায়, আমরা ভারতীয় শহরগুলোতে পাল্টা হামলা করতে দ্বিধা করব না। এটি আমাদের বিকল্প ছাড়া একমাত্র পদক্ষেপ হবে।” সাবেক কূটনীতিক যদিও মন্তব্যটিকে ‘চরম মুহূর্ত’ এবং ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’ হিসেবে অভিহিত করেন, তবুও তার অবস্থান স্থির ছিল। ২০১৪-২০১৭ পর্যন্ত দিল্লিতে পাকিস্তানের শীর্ষ কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আব্দুল বাসিতের মন্তব্য নতুন করে দুই দেশের কূটনৈতিক উত্তেজনা তীব্র করেছে। তিনি এও উল্লেখ করেন যে, পাকিস্তান যুদ্ধ চায় না, কিন্তু দেশের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হলে আত্মরক্ষার জন্য ভারতীয় জনপদে হামলা করা ছাড়া বিকল্প থাকবে না। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সাবেক হাইকমিশনারের মুখ থেকে এ ধরনের উস্কানিমূলক বক্তব্য দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রক্রিয়াকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে এবং পারমাণবিক শক্তিধর দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাসের দেয়ালকে আরও শক্ত করছে।