ইরানের অর্থনৈতিক বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া সরকারবিরোধী আন্দোলন দেশজুড়ে তীব্র সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের তথ্যমতে, টানা ১১ দিনের সংঘাতে অন্তত ৩৪ জন বিক্ষোভকারী প্রাণ হারিয়েছেন এবং সহস্রাধিক মানুষ আটক হয়েছেন।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) রাতেও বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানায়, ইরানের ৩১টি প্রদেশের অন্তত ১১১টি শহর ও নগরে আন্দোলন বিস্তৃত হয়েছে। সহিংসতায় এখন পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ২০০ জন গ্রেপ্তার এবং অন্তত চারজন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, নিরাপত্তা বাহিনী গুলি ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করলে বিক্ষোভকারীরা পাথর নিক্ষেপ করে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লোরদেগান শহরে সশস্ত্র হামলায় দুই পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন।
তেহরান, মাশহাদ, বন্দর আব্বাস ও কাজভিনসহ গুরুত্বপূর্ণ নগরীতে সরকারবিরোধী ও ধর্মীয় নেতৃত্ববিরোধী স্লোগান শোনা যাচ্ছে। আন্দোলনের পেছনে মূল কারণ হিসেবে ডলারের বিপরীতে রিয়ালের নজিরবিহীন পতন, প্রায় ৪০ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করছেন বিশ্লেষকেরা।
অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সরকারের ঘোষিত আর্থিক সহায়তা কর্মসূচিও জনঅসন্তোষ কমাতে ব্যর্থ হয়েছে বলে জানা গেছে। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন হলে কঠোর প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, যা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর শুরু হওয়া আন্দোলনের পর এটিই বর্তমান ধর্মীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ও সংগঠিত জনআন্দোলন, যা দেশটির রাজনৈতিক ও আইনি কাঠামোর জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উত্তেজনা তীব্র হওয়ার মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বিভিন্ন কৌশলগত বিকল্প থাকছে। ভারতের এক্সিওজের তথ্যভিত্তিক এনডিটিভি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মানতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও সম্ভাব্য উত্তরসূরি পুত্র মোজতবা খামেনি-সহ শীর্ষ ধর্মীয় নেতৃত্বকে টার্গেট করার পরিকল্পনাও বিবেচনায় রয়েছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, মার্কিন পক্ষ সীমিত সমৃদ্ধকরণের চুক্তিতে রাজি হতে পারে, তবে তা নিশ্চিত করতে হবে যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো পথ বন্ধ থাকে। সামরিক ও কূটনৈতিক সূত্র জানাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ সামরিক সমাবেশ চলছে, এবং ইসরায়েলও সম্ভাব্য যৌথ পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনায় এখনও মূল বিষয়—ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার—সমাধানহীন রয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, কয়েক দিনের মধ্যে একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি হবে, যা রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনুমোদনের পর যুক্তরাষ্ট্রকে উপস্থাপন করা হবে।
ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা তীব্র হচ্ছে, কারণ মার্কিন বাহিনী সম্ভাব্য কয়েক সপ্তাহব্যাপী সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলার নির্দেশ দিলেই অভিযান শুরু হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই মার্কিন কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত বিমানবাহী রণতরী, যুদ্ধবিমান, গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার এবং সেনা মোতায়েন করছে পেন্টাগন। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে ইরানের ক্ষেত্রে সব অপশন খোলা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ইরানের বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার ও প্রতিশোধমূলক সক্ষমতার কারণে অভিযানের ঝুঁকি অনেক বেশি। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড হুঁশিয়ারি দিয়েছে, তেহরানের ভূখণ্ডে হামলা হলে যেকোনো মার্কিন ঘাঁটিতে প্রতিশোধমূলক হামলা চালানো হবে। এ পরিস্থিতিতে গত বুধবার ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালু থাকলেও যুদ্ধের সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে।
ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এক ইরানি যুবকের মৃত্যু। দেশটির সরকারবিরোধী দমন-পীড়নের প্রতিবাদ জানিয়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে ওই যুবক আত্মহত্যা করেছেন বলে দাবি করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি ও ইরানভিত্তিক একাধিক গণমাধ্যম। প্রতিবেদনে বলা হয়, তেহরানের বাসিন্দা পুরিয়া হামিদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিও বার্তায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানান—ইরানের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা নয়, বরং সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিতে। ইংরেজিতে ধারণ করা প্রায় ১১ মিনিটের ওই ভিডিওতে তিনি দাবি করেন, সরকারবিরোধী আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা কয়েকটি চলমান যুদ্ধের হতাহতের চেয়েও বেশি। ভিডিও বার্তায় হামিদি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সঙ্গে যেকোনো সমঝোতাকে নিহত বিক্ষোভকারীদের প্রতি ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বিদেশি সহায়তা ছাড়া বর্তমান সরকারকে পরাজিত করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন। ভিডিওটি প্রকাশের পরপরই তিনি আত্মহত্যা করেন বলে ইরান ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন মাধ্যমে জানানো হয়েছে। ঘটনাটি ইরানে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। ইরান সরকার এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।