শিরোনাম
সুন্দরবন উপকূলের মাটি ও মানুষের কথা শোনাবে 'অরণ্যলোক ম্যানগ্রোভ মিউজিয়াম'
সুন্দরবন উপকূলের মাটি ও মানুষের কথা শোনাবে 'অরণ্যলোক ম্যানগ্রোভ মিউজিয়াম'

সুন্দরবন নিয়ে অজানার নানা গল্প শোনাবে জঙ্গলবাড়ি ম্যানগ্রোভ রিসোর্টের ব্যতিক্রমী সংগ্রহশালা “অরণ্যলোক ম্যানগ্রোভ মিউজিয়াম”। 
গহীন অরন্যের শুধু বাঘ হরিণ নয় এই সুন্দরবন কেন্দ্রিক মানুষের জীবনসংগ্রাম, ঐতিহ্য আর সমৃদ্ধ সংস্কৃতির ইতিহাসের ছোঁয়া মিলবে এখানে। প্রতিনিয়তই সমৃদ্ধ হচ্ছে এই আয়োজন। 

পশ্চিম ঢাংমারীর সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে একাধিক রিসোর্ট। তারমধ্যে জঙ্গলবাড়ি রিসোর্টে প্রতিনিয়তই আসেন দর্শনার্থীরা। তবে সময় আর সুযোগের অভাবে সুন্দরবন সম্পর্কে জানার একটি বিশাল অংশই বাকি থেকে যায়। তাই ব্যাতিক্রমি উদ্যোগ নিয়েছে রিসোর্ট কতৃপক্ষ। গড়ে উঠতে চলেছে সুন্দরবন কেন্দ্রিক এক বিস্তৃত সংগ্রহশালা। 

জাদুঘরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়বে স্থানীয় মানুষের সৃজনশীলতা ও নিপুণ কারুকার্যের অসাধারণ নিদর্শন। সুন্দরবনের অন্যতম প্রাকৃতিক সম্পদ গোলপাতা, যা সাধারণত ঘর ছাউনির কাজে ব্যবহৃত হয়। তবে এখানে দর্শনার্থীরা দেখতে পাবেন গোলপাতার ফল থেকে প্রস্তুত সুস্বাদু ও পুষ্টিকর আচার, যা অনেকের কাছেই এক নতুন অভিজ্ঞতা। পাশাপাশি সুন্দরবনের খাঁটি খলিসা ও গরান ফুলের মধুর সোনালি আভা দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেবে মৌয়ালদের সাহসিকতা ও অরন্যের রোমাঞ্চকর অভিযানের গল্প।

তুলে ধরা হয়েছে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর হস্তশিল্পকেও।  নকশিকাঁথা কিংবা বাঁশ ও কাঠের তৈরি নানা সামগ্রী দর্শনার্থীদের বলছে উপকূলের মানুষের গল্প। 
এছাড়া জেলেদের ব্যবহারের মাছ ধরার জাল, নৌকার প্রতিকৃতি, বনজীবীদের ব্যবহৃত সরঞ্জাম এবং সুন্দরবনের মাটি দিয়ে তৈরি সাধারন জীবনের নানা সামগ্রী যেন এককথায় বলে দিচ্ছে মানুষের সাথে প্রকৃতির বন্ধনের এক অজানা ইতিহাস। 


অরণ্যলোক ম্যানগ্রোভ মিউজিয়ামের অন্যতম লক্ষ্য হলো স্থানীয় নারী, কারিগর ও বননির্ভর জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন। পর্যটকরা এখান থেকে সরাসরি বিভিন্ন পণ্য ক্রয়ের মাধ্যমে যেমন সুন্দরবনের স্মৃতি নিজেদের সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেন, তেমনি অবদান রাখতে পারেন প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নে। ফলে এই জাদুঘর শুধু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণই করে না, বরং স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

অরণ্যলোক ম্যানগ্রোভ মিউজিয়ামের প্রোপাইটর জাকারিয়া শাওন বলেন, “সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়, এটি আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং লাখো মানুষের জীবিকার উৎস। দীর্ঘদিন ধরে আমি অনুভব করেছি যে সুন্দরবনের প্রকৃত পরিচয় কেবল এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বা বন্যপ্রাণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বননির্ভর মানুষের জীবনসংগ্রাম, লোকজ জ্ঞান, শিল্পকর্ম এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। সেই ভাবনা থেকেই অরণ্যলোক ম্যানগ্রোভ মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আমাদের লক্ষ্য হলো সুন্দরবনের শেকড়, সংস্কৃতি ও মানুষের গল্পকে একটি স্থায়ী প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণ করা এবং দেশ-বিদেশের পর্যটকদের সামনে তা তুলে ধরা। একই সঙ্গে স্থানীয় নারী উদ্যোক্তা, কারিগর ও বনজীবী মানুষের তৈরি পণ্যের জন্য একটি বাজার সৃষ্টি করে তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখা। 

এখানে আগত শিক্ষার্থী, গবেষক ও পর্যটকরা সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবনধারা এবং ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারেন। প্রদর্শিত তথ্য ও উপকরণগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রকৃতি সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ করবে এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের বার্তা পৌঁছে দেবে।
এছাড়া অরণ্যলোক ম্যানগ্রোভ মিউজিয়াম সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে পরিচালিত গবেষণা, তথ্য সংগ্রহ এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের একটি সম্ভাবনাময় কেন্দ্র হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। স্থানীয় লোককথা, গান, বনজীবীদের অভিজ্ঞতা, মৌয়াল ও বাওয়ালিদের জীবনগাথা সংরক্ষণের মাধ্যমে এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অমূল্য জ্ঞানভাণ্ডার হিসেবে কাজ করবে বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।